ভ্যানচালক হাসান হত্যা
রূপক মুখার্জি
, চরকান্দিপাড়া (কালিয়া) থেকে ফিরে
নড়াইলের নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকান্দিপাড়া গ্রামে ভ্যানচালক হাসান শেখ (৪৫) হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এ ঘটনায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লুটপাটের পর কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আট কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। বাড়িঘর হারিয়ে অনেক পরিবার আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছে না।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সরেজমিনে চরকান্দিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া বাড়িগুলোতে পড়ে আছে ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা ঘরের টিন, আসবাবপত্র, ধান-চাল, পাট, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। এরপর কয়েকটি বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। হামলার পর থেকে আতঙ্কে নারী ও শিশুসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পরদিন থেকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় অছিকুর শেখ, অহিদুল শেখ, শেখ তৈয়বুর রহমান, জাহিদ শেখ, সোহরাব শেখ, সাইফুল শেখ, মাহমুদ শেখ, মামুন শেখ, সেকন শেখ, মারুফ শেখ, আকিদুল শেখ, হাসমত শেখ, আমিন শেখ, শাহাবুদ্দিন শেখ, ইখতিয়ার শেখ, ইখলাস শেখ, ইস্কান্দার শেখ ও আজিম গাজীর পরিবারের নাম রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী বাবু শেখের স্ত্রী তসিরন অভিযোগ করেন, সোহেল মেম্বারের নেতৃত্বে আলমগীর, আজিজুল, মাহাবুর, রাসেল, মুক্তিসহ একদল লোক তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তার কানের স্বর্ণের দুল, স্বর্ণের চেইন, স্মার্টফোন ও ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাতের বেলায় তাদের ভবনে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তসিরন বলেন, ‘আমার ছেলেরা বিদেশে থাকে। কষ্ট করে যা কিছু গড়েছিলাম, সব ধ্বংস করে দিয়েছে। ভাঙচুর ও লুটপাট করেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। এখন আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চায়না বেগমের অভিযোগ, হাসান শেখের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোহেল মেম্বারের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িসহ আশপাশের বাড়িঘরে হামলা চালায়। ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পুলিশ এক পাড়ায় অবস্থান করলে হামলাকারীরা অন্য পাড়ায় গিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে তাদের অভিযোগ। ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। হুমকির কারণে এখনো বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। দ্রুত প্রশাসনিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
শেখ তৈয়বুর রহমানের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা ও মেয়ে শিল্পী বেগম বলেন, হাসান শেখ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে তাদের প্রায় ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরতে গেলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, দিনের বেলায় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও রাতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।
অহিদুল ইসলামের স্ত্রী ববিতা বেগম বলেন, ‘আমরা এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুনে আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে থাকার মতো পরিবেশ নেই। আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই।’

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে চরকান্দিপাড়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সোহেল মেম্বার ও আবেদ শেখের পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে হাসান শেখ গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় আরও ১১ জন আহত হন।
আহতদের প্রথমে কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে গুরুতর আহতদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসান শেখের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই হোসেন শেখ বাদী হয়ে নড়াগাতী থানায় ৩৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর আবেদ শেখের পক্ষের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে সোহেল মেম্বারের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে।
নিহত হাসান শেখের মা তাসলিমা বেগম (৬২) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সন্তান হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আমি দোষীদের ফাঁসি চাই।’
নড়াগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হোসেন আলী বলেন, হাসান শেখ হত্যা মামলায় তিনজন এবং ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পৃথক দুটি মামলায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট নয়জনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরকান্দিপাড়া ও কলাবাড়িয়া এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কলাবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে লুট হওয়া মালামালের কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাবের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চরকান্দিপাড়া এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার বাড়িতে ফিরতে পারছে না। তারা দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষয়ক্ষতির প্রতিকার এবং হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।