আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
আট মাসের অবুঝ শিশু আরহাম। সে শুধু চেনে এক জোড়া কোল, আর ভালোবাসার ডাক। ঘুমের ঘোরে ও জাগরণে শিশুটি থেকে থেকে আধো আধো শব্দে ‘আব্বু... আব্বু...’ বলে ডাকছে। নিস্তব্ধ ঘরে মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠা শিশুটিকে শান্ত করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন মা নাজমা খাতুন। পাশে বসে চোখ মোছারও শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিলাপ করছেন, ‘আমার সোনাটা ঘুমাইতে আব্বা আব্বু করতেছে। আমি তো ওর আব্বুর কাছে দিতে পারতিছ নে। ওর আব্বুর জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে... অরে ওর আব্বুরে আমি কোথায় পাবো?’
যার বুকে মাথা গুঁজে শিশুটির ঘুমোনোর কথা, সেই ওয়াহিদুজ্জামান শামীম আর কোনোদিন ফিরবেন না। গত সোমবার সন্ধ্যায় সামান্য পারিবারিক বচসার জের ধরে এক প্রতিবেশীর গোপনে রেকর্ড করা অডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অডিও, পরে উন্মত্ত জনতার তাণ্ডবে হত্যা করা হয়েছে এই ‘মানসিক রোগাক্রান্ত’ যুবককে।
শামীম নিয়মিত অসুস্থ থাকতেন। মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিলে এলোমেলো হয়ে যেতেন, কিন্তু কারো ক্ষতি করতেন না। নিজের জীবন চালাতে কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন, কখনো হোটেলে কাজ করতেন। মাদরাসা থেকে কামিল পাস করা শামীমের মুখে সবসময় থাকতো হাদিস ও কোরআনের বাণী। দৈনিক দুই-তিনটা করে ওষুধ না খেলে সুস্থ হতে পারতেন না। টানা ওষুধ খাওয়ার টাকা জোগাড় করতে মানুষকে ধরে ঘুরে ঘুরেই টাকা আনতে হতো তাকে। ওষুধ না থাকলে ঘরের এক কোণে কিংবা নিজের মতো শুয়ে কাটিয়ে দিতেন।
অশ্রুসজল চোখে স্ত্রী নাজমা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী তো মানসিক রোগী, ওষুধ ছাড়া একটা দিনও চলতে পারতো না। জুতোও ছিল না পায়ে। এমনও দিন গেছে সপ্তাহকে সপ্তাহ সে নিজে নিজে শুইয়ে জীবন কাটাইছে, দুটো ভাতও খেতে পারতো না। এতটুকু অসুস্থ মানুষের সাথে কে শত্রুতা করবে? কেন তারে এভাবে মারলো?’
হঠাৎ হঠাৎ শামীমের মাথা গরম হয়ে যেত এবং স্ত্রীকে মারধর করতেন। ঘটনার দিন শামীমের মাথা গরম হলে স্ত্রী নিজেই বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার আশায়। কারণ নাজমা জানতেন, ঘণ্টাখানেক পর শামীমের মাথা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘরের ভেতরে তাদের বাকবিতণ্ডার কথা গোপনে অডিও রেকর্ড করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। এরপর তথাকথিত ‘ধর্মীয় অবমাননার’ তকমা দিয়ে ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে ‘তৌহিদি জনতা’ আহ্বান করে এক অসুস্থ মানুষকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
ক্ষোভ আর কষ্টে নাজমা প্রশ্ন তুলেছেন সমাজের বিবেক নিয়ে। ‘আমার স্বামী অন্যায় তো করেছিল আমার সাথে। আমি তো কোনো বিচার চাইনি। কারণ আমি জানি মানসিক রোগী সে, একটু পরেই মাথা ঠান্ডা হয়ে আমাদের মিল হয়ে যেত। আর সে যদি সত্যিই অন্যায় করে থাকতো, দেশে পুলিশ আছে, পাগলা গারদ আছে, জেলে দিতো বা ফাঁসি দিতো। দুনিয়া থেকে সরায়ে দিলো কেন?’
১২ বছরের এক ছেলে আর আট মাসের এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে এখন ঘোর অন্ধকারে নাজমা। উপার্জনের একমাত্র মানুষটা হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারটি এখন বেঁচে থাকার তাগিদে দিশেহারা। কোনো কাজে যুক্ত হবেন, কোলে আট মাসের বাচ্চার কারণে সেই অবস্থাও এখন তার নেই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা খাতুন বলেন, ‘আমার সংসার কীভাবে চলবে এখন? ছোট দুটি সন্তানকে যারা এতিম করে দিলো, তারা এখন এই অবুঝ বাচ্চাদের ও আমার দায়িত্ব নিক। আমার স্বামী তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু আমাদের এখন কী হবে?’
সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম অপব্যবহার করে নৃশংসতা ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পিতৃহারা দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রহর গুণছেন এই অসহায় নারী।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেছেন। মামলায় পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে দশজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরে পুলিশি অভিযানে এজাহারভুক্ত ছয় নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন এবং অন্য আসামি আসাদুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।