তারিক মোহাম্মদ
, ঝিকরগাছা (যশোর)
যশোরের ঝিকরগাছায় মাদরাসা পরিচালক কর্তৃক যৌনপীড়নের শিকার দুই জমজের ঘটনাটি ‘আপসরফা’ হয়ে গেছে।
শিশুদের মা রোববার বলেছেন, আমার মেয়েদের মাদরাসা থেকে বের করে দেওয়ায় রাগের মাথায় আমি হুজুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলাম। এখন আর আমার কোনো অভিযোগ নেই।
অবশ্য, শনিবার দুই শিশু পীড়নের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রওজাতুল জান্নাত বালিকা হাফেজিয়া মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মো. আব্দুর রহমান এই প্রতিনিধিকে বলেছিলেন- বিষয়টি পলাশ নামে এক বিএনপি নেতা দুইপক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করছেন। এতে তিনি সফলও হয়েছেন।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা থানার ওসি মো. গোলাম কিবরিয়া হাসান বলেন, শনিবার তাদের অভিযোগ দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তারা দেয়নি। গরিব মানুষ টাকায় ম্যানেজ হয়ে গেলে আমি-আপনি কী করবো? এভাবেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, যৌনপীড়নের শিকার শিশু দুটির অভিযোগ, বিভিন্ন সময় পরিচালক তাদের আলাদাভাবে তার কক্ষে ডেকে নিতেন। সেখানে গা, হাত-পা টিপে দেওয়ার কথা বলে তাদের জামা ও পায়জামার ভেতরে হাত দেওয়া হতো। এসব ঘটনা কাউকে না জানতে শাসানো হতো ।
শিশুদের মা জানিয়েছিলেন, মাদরাসা থেকে বাড়িতে এলে মেয়েরা আর সেখানে যেতে চাইতো না। কারণ জানতে চাইলেও তারা কিছু বলতো না। পরে তারা জানায়- পরিচালক তাদের আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করতেন। একবার এক মেয়েকে জোর করে জাপটে ধরে শোয়ানোর চেষ্টা করা হলে সে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
শনিবার তিনি মেয়েদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন।
শিশুদের সৎ বাবা বলেছিলেন, মাদরাসায় ভর্তির তিন-চার মাস পর থেকেই আব্দুর রহমান মেয়েদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। ভয়ে এতোদিন তারা মুখ খোলেনি।
এদিকে, আবু বক্কার সিদ্দিক নামে এক অভিভাবক বলেন, আমার মেয়েকে ওই মাদরাসায় ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু সেখানে শিশুদের থাকার পরিবেশ ভালো নয় এবং শিশুদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এ কারণে মেয়েকে মাদরাসা থেকে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করেছি।
মাদরাসার পরিচালনা কমিটি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
রওজাতুল জান্নাত বালিকা হাফেজিয়া মাদরাসা নিয়ে খোদ কমিটির সাবেক সদস্য ও স্থানীয়দের নানা প্রশ্ন উঠেছে।
কেননা প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি হলেন পরিচালকের জামাতা, পরিচালক নিজেই কমিটির সেক্রেটারি এবং তার স্ত্রী ও মেয়ে শিক্ষকতার দায়িত্বে রয়েছেন।
২০২১ সালে স্ত্রী রুবিনা খাতুনের নামে কেনা পাঁচ শতক জমির ওপর দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘরে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক ও বায়তুল আকসা মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বোর্ড, ঢাকা থেকে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নম্বর ইলহাক-ম-৬/৩৩২০।
বর্তমানে মাদরাসায় প্রায় ৬৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ জন আবাসিক। তাদের তিনতলা ভবনের নিচতলার একটি সংকীর্ণ কক্ষে রাখা হয় বলে জানা গেছে।
পরিচালক আব্দুর রহমান জানান, মাদরাসার হিফজ বিভাগ এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালু রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন।
নাজেরা বিভাগের দায়িত্বে তার স্ত্রী রুবিনা বেগম এবং হিফজ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার বড় মেয়ে হাফেজা হাফসা খাতুন।
পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদরাসা পরিচালনা কমিটিতে ১১ জন সদস্য রয়েছেন। তার বড় জামাতা হাবিবুর রহমান রাফি কমিটির সভাপতি এবং তিনি নিজে সেক্রেটারি ও পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে, কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে মাত্র দুই-তিনজনের নাম বলতে পেরেছেন তিনি।
কমিটির পূর্ণাঙ্গ লিখিত তালিকাও দিতে পারেননি। নিয়মিত সভা হয় না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ঝিকরগাছা সরকারি এমএল হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাছিম বিল্লাহ শিশু অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ এসএম মাহবুবুল আলম মন্টু বলেন, মাদরাসার সূচনালগ্নে আমি ছিলাম। কিন্তু মাদরাসার নামে জমি লিখে না দিয়ে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে পারিবারিকভাবে পরিচালনার কারণে আমি সেখান থেকে সরে আসি।
ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম সাইফুল্লাহ বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। মাদরাসার কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা তদন্ত করা হবে।
সম্প্রতি মাদরাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে এতিম দুই জমজ বোনকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
এদিকে, অভিযুক্ত আব্দুর রহমান রোববার বিকেলে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি প্রকাশিত সংবাদটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেন। সেখানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই সমস্যা মিটে গেলে কিছু দিনের মধ্যেই মাদরাসা ওয়াকফ করে দেবো।