বছরের আট মাসে যশোরে আক্রান্ত প্রায় দুই হাজার
সৈয়দ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
যশোরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই থামছে না। ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি সাধারণ মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের দশ মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ, যার মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন দু’জন। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় জেলাজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ডেঙ্গু প্রতিবেদন থেকে এসব উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত যশোর জেলায় মোট এক হাজার ৯৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন এক হাজার ৮২৫ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে ৪২ জনকে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০০ রোগী।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১২ জন ডেঙ্গু রোগী উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারজন রোগী ভর্তি হয়েছেন শার্শা উপজেলায়। এছাড়া কেশবপুরে তিনজন, অভয়নগরে দুইজন, মণিরামপুরে দুইজন এবং চৌগাছায় একজন রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে, স্বস্তির বিষয় হলো, গত ২৪ ঘণ্টায় বেসরকারি হাসপাতালে নতুন কোনো রোগী ভর্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।
চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে অভয়নগর ও যশোর সদর উপজেলা। এসময় এলাকাভিত্তিক আক্রান্তের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭২৮ জন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৪০১, কেশবপুর উপজেলায় ২২০, শার্শায় ১৯৯, বাঘারপাড়ায় ১৭৮, মণিরামপুরে ১২৩, ঝিকরগাছায় ৬৮ এবং চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৩ জন বিভিন্ন বয়সের রোগী ভর্তি হন।
এদিকে, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার কামড়ানোর নির্দিষ্ট সময় ও আচরণ নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকরা। সহকারী অধ্যাপক ডা. আবু হায়দার মনিরুজ্জামান জানান, এডিস মশার একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ছন্দ রয়েছে। সূর্যোদয়ের পরের প্রথম দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের দুই থেকে তিন ঘণ্টা এরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এবং কামড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এই সময়ে সবাইকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি আরও জানান, উজ্জ্বল বা চকমকে রঙের পোশাক এডিস মশাকে বেশি আকৃষ্ট করে। তাই ডেঙ্গুর এই সময়ে পোশাকের রঙ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি। হাসপাতালের পাশাপাশি কমিউনিটি বা সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি চিকিৎসকদের সর্বদা জনগণের পাশে থেকে নিরলস সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা পেশিতে ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে কোনো প্রকার গুজব বা অপচিকিৎসায় কান না দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করলে অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার বা প্লাস্টিকের বোতলে জমে থাকা পানি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘরের ভেতরের পানির পাত্র সবসময় ঢেকে রাখা, দিনে ও রাতে মশারির ভেতর ঘুমানো এবং শরীর ঢাকা লম্বা পোশাক পরা অত্যন্ত জরুরি। যশোর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিক যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, তবেই ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।