এজাজ উদ্দিন টিপু
দেখতে দেখতে একটি বছর কেটে গেল। স্বপ্নের সুবর্ণভূমি পদার্পণ করলো দ্বিতীয় বছরে। প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এ শুধু একটি পত্রিকার বছরপূর্তি নয়, এটি আমার দীর্ঘদিনের সুপ্ত অথচ প্রখর একটি স্বপ্নেরও যেন বর্ষপূর্তি।
স্কুলজীবন থেকেই সংবাদপত্রের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সখ্য। মহল্লার ছামছুদ্দিন মামার লন্ড্রির দোকানে আড্ডার ফাঁকে দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টে দেখার মধ্য দিয়ে যা শুরু। একসময় নিয়মিত পত্রিকা পড়া অভ্যাসে পরিণত হলো, আর পরবর্তীতে সেই অভ্যাসই নেশায় রূপ নিলো। আজও সেই নেশা অটুট।
একটা সময় ফটোসাংবাদিকতা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করতো। এলোমেলো চুল, গায়ে খাকি রঙের কটি (ছোট জ্যাকেট বা ভেস্ট), হাতে লম্বা লেন্সের ক্যামেরা—ঘটনাস্থলে সবার আগে পৌঁছে যাওয়া সেই নির্ভীক মানুষগুলো আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করতো। প্রতিটি সংবাদে তাদের সম্মুখসারিতে অবস্থান, সত্যকে ক্যামেরাবন্দী করার সাহসী ছোটাছুটি আমাকে মুগ্ধ করতো। বাস্তব জীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেই সুপ্ত স্বপ্ন কখনো প্রকাশ করতে পারিনি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রতি ভালোবাসা মনের গহিনে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছিল।
এরপর দীর্ঘ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলি। তবে সংবাদমাধ্যম এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।
সেই ভালোবাসা ও আগ্রহ থেকেই বন্ধু গালিব হাসান পিল্টুর সহযোগিতায় যুক্ত হই সুবর্ণভূমি নিউজ পোর্টালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। সেসময় সুবর্ণভূমি পাঠকের মন জয় করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান নিউজ পোর্টালে পরিণত হয়।
সুবর্ণভূমিকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাঠকের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম যুক্ত করা হলো। নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছিল আমাদের পথচলা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই নবযাত্রার মাত্র ১৮ মাসের মাথায় তৎকালীন সরকার অন্যান্য আরও কিছু পোর্টালের সাথে বন্ধ করে দেয় আমাদের প্রিয় সুবর্ণভূমিও।
এরপর কিছুদিনের বিরতি। তবু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি গুরুত্ব পেত পত্রিকার বিভিন্ন সংবাদ, স্টোরি এমনকি ছবির বিষয়ও।
একদিন এমনই এক আড্ডায় বন্ধু এহসান-উদ-দ্দৌলা মিথুনের সঙ্গে যশোরের প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক কল্যাণকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি নতুন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হলো।
মিথুন যখন তার স্বপ্নের কথা বলছিল, আমার মনে হচ্ছিল, এ যেন আমার নিজের মনের কথাই তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে।
বন্ধুর আগ্রহে আমরা দু’জনে আমাদের পরিকল্পনাগুলো দৈনিক কল্যাণের প্রকাশক ও সম্পাদক শ্রদ্ধেয় একরাম-উদ-দ্দৌলার কাছে তুলে ধরলাম। তিনি সম্মতি দিলেন। একজন প্রবীণ প্রকাশক ও সম্পাদকের হাত ধরে যশোরের প্রাচীনতম দৈনিক কল্যাণকে নতুন উদ্যমে এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হলো। একঝাঁক অভিজ্ঞ ও দক্ষ সংবাদকর্মী, আধুনিক সাজসজ্জা এবং উন্নত প্রিন্টিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে রঙিন কাগজে দৈনিক কল্যাণ হয়ে উঠলো দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর একটি।
এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কোথাও যেন নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমার সেই পুরনো স্বপ্নটি এখনও অপূর্ণ।
৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তাই আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি— নিজেকে একজন প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মেলে ধরার।
আবারও আলোচনা শুরু হলো বন্ধ হয়ে যাওয়া সুবর্ণভূমিকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে। শ্রদ্ধেয় আহসান কবীরের সঙ্গে শুরু হলো নতুন পথচলা। সুবর্ণভূমিকে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশের অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হলো। বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আহসান কবীর অল্প সময়ের মধ্যে একটি কঠিন কাজ সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই পথচলারই আজকের পরিণতি—দৈনিক সুবর্ণভূমি।
আজ সুবর্ণভূমি শুধু একটি পত্রিকা নয়; যশোরসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসার একটি নাম। তবে এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তির নয়। এর পেছনে রয়েছে অনেক মানুষের শ্রম, ভালোবাসা, পরামর্শ ও সহযোগিতা।
প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দঘন মুহূর্তে সুবর্ণভূমির জন্ম ও পথচলায় যারা শুরু থেকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, পাশে থেকেছেন এবং সাহস জুগিয়েছেন, তাদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
একই সাথে কৃতজ্ঞতা আমাদের লেখক, সাংবাদিক, পাঠক, দর্শক, শুভানুধ্যায়ী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রতিও। আপনাদের আস্থা ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সুবর্ণভূমির পথচলা মাত্র এক বছরে থেমে থাকার নয়। সামনে আরও দীর্ঘ পথ, আরও বড় স্বপ্ন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সত্য, সাহস ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের কথা বলাই আমাদের অঙ্গীকার।
সুবর্ণভূমি মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে বেঁচে থাকবে। সত্যের পক্ষে, মানুষের পাশে—সুবর্ণভূমি এগিয়ে যাবে বহুদূর ইনশাআল্লাহ।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সুবর্ণভূমি