যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি কমাতে চাই কার্যকর কৃষি ব্যবস্থাপনা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি কমাতে চাই কার্যকর কৃষি ব্যবস্থাপনা

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার বড় অংশ নির্ভরশীল এ খাতের ওপর। সময়ের সঙ্গে কৃষিতে বৈচিত্র্য এসেছে। প্রচলিত ধান ও পাট চাষের পাশাপাশি কৃষকরা এখন বেশি লাভের আশায় উচ্চমূল্যের সবজি ও অন্যান্য অর্থকরী ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে সেই সম্ভাবনাই অনেক সময় কৃষকের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কুষ্টিয়ার মিরপুরে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির ক্ষেতে পচন ও পোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব তারই একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ।

মিরপুর উপজেলার বড়বাড়িয়া মাঠে আগাম সবজি চাষ করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বাজারে ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা হলেও রোগের কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে দেড় লাখ টাকার ফসল বিক্রির প্রত্যাশা করেছিলেন। অথচ এখন পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকার। অন্যদিকে, বাঁধাকপি চাষে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেও কোনো কোনো কৃষক পুরো জমির ফসল হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এই চিত্র শুধু কয়েকজন কৃষকের লোকসানের গল্প নয়; এটি কৃষির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতারও প্রতিফলন।

আগাম সবজি চাষের প্রধান আকর্ষণ হলো অসময়ে বাজারে পণ্য সরবরাহ করে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া। কিন্তু মৌসুমের বাইরে চাষাবাদে আবহাওয়া, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বেশি থাকে। ফলে অধিক লাভের আশায় চাষাবাদে নামার আগে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সঠিক পরামর্শ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু বাজারদরের ওপর নির্ভর করে ফসল নির্বাচন করলেই হবে না; জমির উপযোগিতা, বীজের মান, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

মিরপুরে আক্রান্ত জমি পরিদর্শন করে কৃষি বিভাগ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মাটি এবং রোগাক্রান্ত গাছের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিকভাবে বীজ ও মাটিবাহিত রোগের পাশাপাশি আবহাওয়াজনিত কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষাগারের ফল পাওয়ার আগে রোগের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একই সঙ্গে রোগের বিস্তার ঠেকাতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষকদের হাতে কার্যকর, নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে কৃষকদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেকেই সারের দোকান বা পরিচিতজনের পরামর্শে অনুমাননির্ভর বালাইনাশক প্রয়োগ করেন। এতে রোগ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই রোগ শনাক্ত না করে ওষুধ প্রয়োগের প্রবণতা বন্ধে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কৃষক সমাবেশ এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বালাইনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদিত পণ্য, সঠিক মাত্রা ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি কমাতে বীজ ও মাটি শোধন, মানসম্মত বীজ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ এবং ফসল পর্যায়ক্রম অনুসরণের বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা জরুরি। চাষের আগে মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমতে পারে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা, কারণ নির্ণয় এবং প্রতিকারমূলক নির্দেশনা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তবে কৃষকের ক্ষতি কমাতে শুধু পরামর্শ দিলেই চলবে না; প্রয়োজন ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং ফসলবিমার মতো কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত। লাভজনক কৃষির ভিত্তি হলো পরিকল্পিত উৎপাদন, বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)