বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক। সনাতন ধর্মের বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, মমতা ও কল্যাণের প্রতিমূর্তি। তার আবির্ভাবের পৌরাণিক কাহিনি মানুষের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দেয়, অন্যায় যত প্রবলই হোক, সম্মিলিত শুভশক্তি, ন্যায়নিষ্ঠা ও সাহসের কাছে তার পরাজয় অনিবার্য। তাই দেবী দুর্গা মর্ত্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের এক অনন্য প্রতীক।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বা ‘দুর্গাসপ্তশতী’তে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ও অসুরবিনাশের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে। পুরাণকথা অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গরাজ্য হারিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরসহ দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তি দুর্গা। দেবতারা তাকে নিজেদের অস্ত্র প্রদান করেন। সিংহবাহী দেবী সেই সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হয়ে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং তাকে পরাজিত করেন। এই কাহিনির অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো, বৃহত্তর কল্যাণের প্রশ্নে বিভক্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়। অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রতিরোধই মুক্তির পথ।
দেবীমাহাত্ম্যে মহিষাসুর ছাড়াও মধু-কৈটভ, ধূম্রলোচন, চণ্ড-মুণ্ড, রক্তবীজ এবং শুম্ভ-নিশুম্ভের মতো অসুরদের বিরুদ্ধে দেবীর সংগ্রামের বিবরণ রয়েছে। প্রতিটি আখ্যানের মধ্য দিয়ে অশুভ প্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের তাৎপর্য ফুটে ওঠে। রক্তবীজের কাহিনি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যায়ের উৎস নির্মূল না করলে তার বিস্তার বারবার ঘটতে পারে।
পুরাণে দেবী ঘোষণা করেন, যখনই অসুরশক্তির অত্যাচারে জগতে বিপর্যয় দেখা দেবে, তখনই তিনি আবির্ভূত হয়ে বিশ্বকল্যাণে অশুভের বিনাশ করবেন। দেবীমাহাত্ম্যের উত্তরকথায় তার বিভিন্ন রূপে আবির্ভাবের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। দুর্ভিক্ষের সময় জীবজগতের খাদ্য জোগাতে শাকম্ভরী রূপে আবির্ভাব এবং ভয়ংকর অশুভ শক্তির বিনাশে ভীমা ও ভ্রমরী রূপ ধারণের বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব আখ্যানের তাৎপর্য কেবল যুদ্ধজয় নয়; মানুষের খাদ্য, নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষাও দেবীর কল্যাণভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
দেবীকে স্মরণ করলে বিপদ ও ভয় থেকে মুক্তি এবং সৎকর্মে প্রেরণা লাভের যে আশ্বাস পুরাণে রয়েছে, তার মানবিক ব্যাখ্যা হলো, সত্য, সাহস ও ন্যায়ের আদর্শ মানুষকে সংকট মোকাবিলায় শক্তি জোগায়। দেবীর মাহাত্ম্য তাই শুধু পূজামণ্ডপে বন্দী নয়; তা মানুষের বিবেক ও কর্মের মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, বৈষম্য, পরিবেশবিনাশ ও ক্ষমতার অপব্যবহার মানবসভ্যতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় মহিষাসুরবধের কাহিনি আমাদের শেখায়, অশুভের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সততা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্য, ঘৃণার বিরুদ্ধে সহমর্মিতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শান্তির চর্চাই হতে পারে আধুনিক সমাজে দুর্গাশক্তির যথার্থ প্রকাশ।
দেবী দুর্গা নারীশক্তিরও প্রতীক। তার দশ হাতে বহুবিধ অস্ত্রের প্রতীকী তাৎপর্য হলো, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় নারীর সামর্থ্য ও নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া। অথচ আজও বহু নারী নির্যাতন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। দেবীর পূজা তখনই অর্থবহ হবে, যখন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র তার সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
দুর্গাপূজার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো সম্প্রীতি। ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ সবার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। কোনো মানুষের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা পরিচয়ের কারণে তার অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে না। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে দেবীর কল্যাণবাণীর বাস্তব প্রতিফলন।
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য আমাদের এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, ন্যায়বিচার হবে সবার জন্য সমান, শিক্ষা ও চিকিৎসা হবে সহজলভ্য এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূর করতে রাষ্ট্র দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় নয়, মানুষের পরিচয় হবে তার মানবিক মর্যাদা; যেখানে ভিন্নমত শত্রুতা সৃষ্টি করবে না, বরং যুক্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পথ প্রশস্ত করবে।
দুর্গাপূজার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন উৎসবের আলো পৌঁছাবে দরিদ্রের ঘরে, অসহায়ের জীবনে এবং নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে। প্রতিমার সামনে অঞ্জলি দেওয়ার পাশাপাশি যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, অসহায়ের হাত ধরি, নারীকে সম্মান করি এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হই, তবেই পূজা জীবনের বৃহত্তর সাধনায় পরিণত হবে।
দেবী দুর্গা অশুভ বিনাশের শক্তি, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় এবং মানবকল্যাণের অনন্ত প্রেরণা। তার আগমনী বার্তা তাই কেবল ধর্মীয় আবেগের নয়; তা ন্যায়, সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান। আসুন, দুর্গোৎসবের চেতনায় আমরা এমন এক অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের শপথ নিই, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বাঁচবে, মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠবে এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির অংশীদার হবে। শুভশক্তির এই জয়ই হোক দুর্গাপূজার চিরন্তন মাহাত্ম্য।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, রাইটস যশোর