স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
শারদীয় দুর্গোৎসবের ঢাক-ঢোল আর আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে চারদিক। উৎসবের ঢাক-ঢোল, আলোকসজ্জায় ভাসছে মণ্ডপগুলো। কিন্তু সেই রঙিন আলোর ঝিলিকও ঢাকতে পারছে না একবুক চাপা হাহাকার। আলোর মেলায় যেন জড়িয়ে আছে এক গভীর গুমোট আঁধার, যেখানে আনন্দের সব রঙ ফিকে হয়ে গেছে। কারণ, যে ঘরটিতে হাসি আর চঞ্চলতায় মেতে থাকার কথা ছিল ১৭ বছর বয়সী কিশোরী শিপ্রা ঘোষের, সেই ঘরে আজ শুধুই বিষাদের ছায়া।
গত মাসেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায় ভাতুড়িয়া হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষ। তার আবাস ছিল শহরের চাঁচড়া এলাকায় ঐতিহাসিক শ্রীশ্রীদশমহাবিদ্যা মন্দির চত্বরে। অভিযোগ, মন্দিরটির পুরো চত্বর দখলে নেওয়ার জন্য ইসকনের কথিত সাধুরা সেখানে বংশপরম্পরায় বসবাসরতদের উচ্ছেদের নানা চক্রান্ত শুরু করেন। শিপ্রা ও আশপাশের বাসিন্দাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনও চলতে থাকে। শিপ্রার পরিবারের ভাষ্য, ইসকনের কথিত সাধু অপার গোবিন্দ দাসসহ অন্যদের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় এই কিশোরী।
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে যখন সনাতনিদের প্রতিটি ঘরে খুশির আমেজ, তখন শিপ্রাদের বাড়ির আঙিনায় ঝুলছে একটি ব্যানার; যেখানে অপার গোবিন্দ দাসসহ ইসকনের কথিত সাধুদের ফাঁসি চাওয়া হয়েছে। ব্যানারের একদিকে নির্জীব, চিরতরে ঘুমিয়ে পড়া শিপ্রার ছবি, আর অন্যদিকে অভিযুক্ত অপার গোবিন্দ দাসের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝোলানো ছবি দিয়ে এলাকাবাসী একসুরে দাবি তুলেছেন, ‘খুনি অপার গোবিন্দ দাস, অর্জুন কৃষ্ণ দাস, পার্থ কৃষ্ণ দাস, পবিত্র দাস, সঞ্জয়, সাধন অধিকারী, পাপিয়া অধিকারীসহ সকল মদদদাতাদের ফাঁসি চাই’। উৎসবের আলোকসজ্জা এই বিচারের দাবিকে আরও বেশি তীক্ষ্ণ ও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।
অন্যান্য বছরগুলোতে পূজার দিনগুলোতে শিপ্রাদের ঘরে বইতো আনন্দের বন্যা। শিপ্রার ভাই পাপন কুমার ঘোষ জানান, প্রতিবছর পূজার আগে তিনি আর শিপ্রা মিলে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করতেন। পূজার দিনগুলোতে নতুন কাপড় পরা, প্রতিমা দর্শন, হাসিখুশি থাকা, আনন্দ করা সবকিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিপ্রা। কিন্তু এবার যেন সব থেমে গেছে।
পাপন ঘোষ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের তো খুবই খারাপ লাগতেছে। আমরা তো এবার পুজোয় তেমন কিছু কেনাকাটাও করিনি। সবক্ষেত্রে আমাদের শিপ্রার অভাবটাই মনে হচ্ছে। এবার আমাদের মন ভীষণ খারাপ, আমরা ভীষণ ব্যথিত।’
শিপ্রার কাকি চোখের জল মুছতে মুছতে জানান, পরিবারের মেয়েদের মধ্যে শিপ্রা ছিল সবার ছোট, কিন্তু সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও মেধাবী। পুজোর যাবতীয় কাজ, মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সবই ও একা হাতে হাসিমুখে সামলে নিতো। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, আজ পূজা এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই লক্ষ্মী মেয়েটি আর নেই।
পূজামণ্ডপে আসা শিপ্রার সহপাঠীরাও আজ শোকে পাথর। সহপাঠী আশিক শীল বলে, ‘আমরা সব বন্ধুরা একসাথে পুজো দেখতে আসতাম, ঘুরে বেড়াতাম, আনন্দ করতাম। অথচ প্রিয় ক্লাসমেট শিপ্রা আজ আমাদের মাঝে নেই। গত মাসের ১৮ তারিখ শুক্রবার মন্দিরে অনুষ্ঠান চলাকালে কীভাবে তাকে অপমানের শিকার হতে হয়েছিল, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। ওই অপার গোবিন্দের মানসিক নির্যাতনেই আমাদের সহপাঠীকে হারিয়ে ফেলেছি। এই পুজোর আনন্দ আজ আমাদের কাছে বিষাদে পরিণত হয়েছে।’
দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পুরোহিত তপন চক্রবর্তী বলেন, ‘পুজো চলাকালে শিপ্রা পাশে থেকে আমাকে সহযোগিতা করতো, কাজ এগিয়ে দিতো। শিপ্রার মতো ধর্মীয় কাজে উৎসাহী ও নম্র মেয়ের এভাবে চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
শিপ্রার অকালমৃত্যুর এক মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তীব্র ক্ষোভ রয়েছে স্বজন আর এলাকাবাসীর মধ্যে। তাই উৎসবের প্যান্ডেলের আলোতেই ফাঁসির দাবির ব্যানার ঝুলিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা।