যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

রস-গুড়ে ১২০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যশোরে গাছিদের ব্যস্ততা

রাব্বি আল-আমিন

, যশোর

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
রস-গুড়ে ১২০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যশোরে গাছিদের ব্যস্ততা

গ্রামীণ জনপদে এখন শীতের আগমনী বার্তা। চারদিকে চলছে খেজুর গাছ তোলা, ডালা-দড়া গোছানো আর গাছিদের ব্যস্ত সময় পার করার চিত্র।

২০২৪ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই যশোরের খেজুরগুড়ের বাজার সম্প্রসারণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। খেজুররস থেকে তৈরি সিরাপ বিদেশে পাঠানোর চিন্তা জেলা প্রশাসনের।

চলতি শীত মৌসুমে এই ঐতিহ্যবাহী খাত ঘিরে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্ট চাষি, গাছি ও ব্যবসায়ীরা।

তবে, এই সম্ভাবনার পেছনের চিত্রটি সবসময় কুয়াশামুক্ত নয়। একদিকে নতুন গাছি তৈরি না হওয়া, গাছ নিধন এবং ইটভাটায় অবৈধ কাঠ পোড়ানোর ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই শিল্প, অন্যদিকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পেশাদার গাছিরা।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়ে গেছে জোর প্রস্তুতি। কোথাও চলছে খেজুর গাছের ডালপালা ছাঁটাই, কোথাও বসানো হচ্ছে রস সংগ্রহের নলি। আবার কেউ গাছে উঠে দিচ্ছেন প্রথম ‘চাচ’, কিংবা শান দিচ্ছেন গাছি দায়ে।

জেলার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার গাছি এখন ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। প্রথম চাচের পর আরও দুই দফা পরিচর্যা শেষে গাছে বসানো হবে মাটির ভাড় বা ঠিলে। এরপরই ফোঁটায় ফোঁটায় জমতে শুরু করবে খেজুরের রস। আর সেই রস থেকেই তৈরি হবে ঐতিহ্যবাহী গুড় ও পাটালি।

কৃষিবিভাগের তথ্য মতে, জেলার আটটি উপজেলায় সব মিলিয়ে মোট ২২ লাখ ৫৯ হাজার ৭১১টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণ বয়সের গাছ তিন লাখ ৪২ হাজার ৬২৬টি, ৫-১০ বছরের গাছ ১২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৩টি এবং পাঁচ বছরের কম বয়সের গাছ সাত লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪টি।

বর্তমানে তিন লাখ ২৯ হাজার ১৯৬টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। রস সংগ্রহের কাজে সরাসরি যুক্ত গাছির সংখ্যা ছয় হাজার ২৫০ জন এবং কৃষকের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৪৪ জন।

জেলায় মোট ৫২ কোটি ৮৮ লাখ ৬৯ হাজার ৫৯৫ লিটার রস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা থেকে মোট ৭,০৯০ মেট্রিক টন গুড় পাওয়া যাবে। উৎপাদিত এই গুড়ের মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ১১১ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প লাভজনক ও সম্ভাবনাময় হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে নানা সংকট। চার মাসের এই শীত মৌসুমে পেশাদার গাছিরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন।

মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের বাঙালিপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ গাছি আতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমি ভ্যানগাড়ি চালাই। আশ্বিন মাসে দা, দড়া, তাড়া বাইন দৌড়ি গোছাই। কার্তিক মাস পড়লেই এই গাছ ঝোড়া শুরু, আর ওই ফাল্গুন পর্যন্ত গাছ কাটবো।’

‘দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে যুক্ত আছি। অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে ছোটবেলা থেকেই এই পেশায়। তরুণ প্রজন্ম পড়াশোনা বা অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ায় নতুন কোনো গাছি তৈরি হচ্ছে না,’ বলেন তিনি।

মৌসুমের শুরুতে দা, দড়া ও সরঞ্জামাদি তৈরি করতে একজন গাছির দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ, বর্তমান বাজারে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন। সরকারি প্রণোদনা বা সহায়তা না পাওয়ায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

আরেক গাছি আনিসুর রহমান বলেন, ‘আব্বা মারা যাওয়ার পর খেজুর গাছে ওঠার লোক ছিল না। তখন স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে আমাকে খেজুর গাছে উঠতে হলো। ছোট ভাই-বোনের জন্যে শেষমেষ এই পেশা বেছে নিলাম। শীতে এই কাজ আর গরমের সময় গলদা চিংড়ি মাছের পোনা ধরি।’

যশোর শহরতলীর আরবপুর এলাকার আতিয়ার রহমান বলেন, ‘‘প্রত্যেক বছর এয়ারপোর্ট বাইপাস রোডে ছয়শ’ গাছ লিজ নিয়ে কাটি। এখন গাছের পেছনে অনেক খরচ, লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। গাছি পাওয়া যায় না, গুড়ের দামও কম।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যশোরে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ খেজুর গাছ রয়েছে। অথচ রস সংগ্রহ করা হয় মাত্র সাড়ে তিন লাখ গাছ থেকে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো গেলে সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, সমৃদ্ধ হবে ঐতিহ্যবাহী খেজুরগুড়ের অর্থনীতি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) সুলতানা আফরোজ বলেন, ‘যশোরে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক এতে সম্পৃক্ত। আমরা তাদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি বসতবাড়ি, পতিত জমি এবং রাস্তার ধারে খেজুর গাছ রোপণ করতে। বিদ্যমান গাছগুলোর পরিচর্যা যাতে ঠিকভাবে করে সে জন্য প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি।’

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘খেজুরের রস ও গুড় যশোরের প্রসিদ্ধ। জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। গাছিদের অনেকক্ষেত্রে কিছু সাপোর্ট দিয়ে থাকি। প্রয়োজন অনুযায়ী গাছিদের সহায়তা, উন্নত পদ্ধতিতে রস আহরণে যে সরঞ্জামাদি দরকার- তা সরবরাহ, রস থেকে গুড় তৈরির উন্নত পদ্ধতি সরবরাহ এবং খেজুর রসের সিরাপ তৈরি করে তা দেশের বাইরে পাঠানোর চিন্তা ভাবনা রয়েছে।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)