পাস করেছে ৪৪.৯২ শতাংশ, জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ৪৬ ভাগ
গোলাম মোস্তফা
, যশোর
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে গত দশ বছরের মধ্যে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বনিম্ন পাসের হার। চলতি বছর পাস করেছে মাত্র ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর পাসের হার ছিল ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
বোর্ডের গত দশ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে যশোর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ০২ শতাংশ। ওই বছর ৯৫ হাজার ৬৯২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ৬৭ হাজার দুইজন। জিপিএ-৫ পেয়েছিল দুই হাজার ৪৪৭ জন।
২০১৮ সালে পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশে। ওই বছর ১ লাখ ২০ হাজার ৬৮৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৬৭ হাজার ২১৯ জন। জিপিএ-৫ পায় দুই হাজার ৪১৬ জন।
২০১৯ সালে পাসের হার বেড়ে হয় ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ওই বছর ১ লাখ ২৬ হাজার ৪০৫ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় ৯৫ হাজার ৫৮০ জন। জিপিএ-৫ পায় পাঁচ হাজার ৩৩৯ জন।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়নের ভিত্তিতে শতভাগ শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। ওই বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৫২৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১২ হাজার ৮৯২ জন।
২০২১ সালেও পাসের হার ছিল ৯৮ দশমিক ১১ শতাংশ। ওই বছর ১ লাখ ২৮ হাজার ১৬৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৪১ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২০ হাজার ৮৭৮ জন।
তবে ২০২২ সাল থেকে পাসের হার কমতে শুরু করে। ওই বছর যশোর বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মোট ৯৮ হাজার ২৬৯ জন। সে সময় ৮৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১৮ হাজার ৭০৩ জন।
২০২৩ সালে পাসের হার আরও কমে দাঁড়ায় ৬৯ দশমিক ৮৮ শতাংশে। ওই বছর এক লাখ ৯ হাজার ৬৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৭৬ হাজার ৬১৬ জন। জিপিএ-৫ পায় আট হাজার ১৩৩ জন।
২০২৪ সালে এক লাখ ২২ হাজার ৫১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ৭৮ হাজার ৭৬৪ জন। পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৪৭ জন ছেলে ও ৪২ হাজার ৫১৭ জন মেয়ে। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯ হাজার ৭৪৯ জন।
২০২৫ সালে পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ২০ শতাংশে। ওই বছর ৫৬ হাজার ৫০৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। জিপিএ-৫ পায় ৫ হাজার ৯৯৫ জন। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ২৪ হাজার ৯০১ জন এবং মেয়ে ৩১ হাজার ৬১০ জন।
চলতি বছর এক লাখ ১৭ হাজার ৫১০ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় এক লাখ ১২ হাজার ৭৯১ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫০ হাজার ৬৬৮ জন। পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২২৮ জন। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৭৬৭ জন, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। এ বছর অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ৪৩ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) যশোর শিক্ষা বোর্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণাকালে বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন ধারাবাহিক ফল বিপর্যয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘ফলাফল বিপর্যয় শব্দটি ঠিক নয়। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল হয়নি, এ কথা বলা যেতে পারে।’
এবারের ফলাফল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ বছর পরীক্ষার্থীদের প্রকৃত নম্বর দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হয়নি। পরীক্ষার্থীদের খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা সচল ছিল। শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সরাসরি পরীক্ষাকেন্দ্র মনিটরিং করা হয়েছে। ফলে পরীক্ষার্থীরা সঠিকভাবে লিখতে পেরেছে এবং প্রকৃত নম্বর পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফলাফলে পাসের হার কমলেও এতে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। আমরা কোয়ালিটি চেয়েছিলাম, কোয়ানটিটি নয়। এবার তা হয়েছে। এতে আমরা খুশি।’
পাস ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে ছাত্রীরা
এ বছরও পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জনে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ হাজার ৮১১ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ২১ হাজার ৫০২ জন। তাদের পাসের হার ৩৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৫৭ হাজার ৯৮০ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৯ হাজার ১৬৬ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৫০ দশমিক ৩০ শতাংশ। মোট ৩ হাজার ২২৮ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী এক হাজার ৮৭০ জন এবং ছাত্র এক হাজার ৩৫৮ জন।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ শীর্ষে রয়েছে। এ বিভাগে ২১ হাজার ৬৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৫ হাজার ১৬৭ জন। পাসের হার ৭০ দশমিক ০৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ৮৫৮ জন; এর মধ্যে ছাত্র এক হাজার ১৭ জন এবং ছাত্রী ৮৪১ জন।
মানবিক বিভাগে ৭৯ হাজার ১৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩০ হাজার ১৯১ জন। পাসের হার ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ১৬৫ জন; ছাত্র ২৬৮ জন এবং ছাত্রী ৮৯৭ জন।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১২ হাজার ১১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ হাজার ৩১০ জন। পাসের হার ৪৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০৫ জন; ছাত্র ৭৩ জন এবং ছাত্রী ১৩২ জন।
পাসের হারে শীর্ষে যশোর, নড়াইল তলানিতে
জেলাভিত্তিক ফলাফলে যশোর জেলা ৫২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পাসের হার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। সবচেয়ে কম পাসের হার নড়াইল জেলায়, ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্যান্য জেলার পাসের হার হলো খুলনায় ৪৬ দশমিক ৬৫, চুয়াডাঙ্গায় ৪৬ দশমিক ১৩, কুষ্টিয়ায় ৪৫ দশমিক ৩৮, সাতক্ষীরায় ৪৩ দশমিক ৪৫, ঝিনাইদহে ৪১ দশমিক ৯৮, মেহেরপুরে ৪০ দশমিক ৭৬, বাগেরহাটে ৩৮ দশমিক ৮৬ এবং মাগুরায় ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
ফলাফলে ইংরেজির প্রভাব
ফলাফল প্রত্যাশিত না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন যশোর শিক্ষা বোর্ড সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ইংরেজিতে পাসের হার ৫৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলায় পাসের হার ৮৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে ৫৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকের স্বল্পতাও শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফলের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আন্তঃবোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানকারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
পাশাপাশি সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামীতে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ফলাফল ঘোষণার সময় অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন ‘ফলাফল বিপর্যয়’ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করে ‘কাঙ্ক্ষিত ফলাফল হয়নি’ কথাটি ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় গত ২ জুলাই। পরীক্ষা শেষ হয় ৮ আগস্ট। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই বোর্ডের পরীক্ষা শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর।