যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

উপকূলে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, জীবিকা, পারিবারিক বন্ধন

আসাদুজ্জামান সরদার

, সাতক্ষীরা

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
উপকূলে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, জীবিকা, পারিবারিক বন্ধন

নোনা পানির তোড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, বদলে যাচ্ছে জীবিকা, ছিন্ন হচ্ছে পরিবারের বন্ধন। একের পর এক দুর্যোগে উপকূলের মানুষ শুধু ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিই হারাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক, লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও। জীবিকার সন্ধানে তরুণেরা গ্রাম ছাড়ছেন, আর পেছনে থেকে যাচ্ছেন নিঃসঙ্গ প্রবীণ বাবা-মা। সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; তা মানুষের জীবন, অধিকার ও অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে উপকূলবাসীর দাবি—নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ, ভিটেমাটি হারানো মানুষের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ। তাদের আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে উপকূলের অনেক জনপদ; হারিয়ে যাবে সেসব জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের শেকড়।

দুর্যোগে বিপর্যস্ত বাস্তুসংস্থান

পরিবেশকর্মী ও গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ এবং দুর্বল বাঁধব্যবস্থা সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদগুলোকে ক্রমেই বিপন্ন করে তুলছে।

তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একের পর এক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস ও বুলবুলের মতো দুর্যোগের পাশাপাশি গত পাঁচ-সাত বছরে মোট ১১-১২টি দুর্যোগ এই উপকূলে আঘাত করেছে। অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের ও স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে বাঁধগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য আঘাতেই বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকছে, কৃষিজমি লবণপানিতে প্লাবিত হচ্ছে। জীবিকা হারিয়ে মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।’

দুর্গাবাটি, হরিণনগর, সিংহড়তলী, গাবুরা, জেলেখালী, প্রতাপনগরের হালদার বাড়ি এবং পদ্মপুকুরের বন্যতলার মতো এলাকার অনেক জায়গায় নদীভাঙনে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

বসতভিটা ও জীবিকা হারানো মানুষের সংকট এখানেই শেষ হচ্ছে না। পরিচিত পেশা ছেড়ে অনেকে বাধ্য হয়ে নতুন জীবিকা খুঁজছেন। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ভ্যান কিনছেন, কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু আয় অনিশ্চিত হওয়ায় ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে তাদের কেউ কেউ আবার ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

এভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঋণের বোঝা, কর্মসংস্থানের সংকট ও নতুন পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই, বলছিলেন পীযূষ বাউলিয়া।

হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতি, বাড়ছে অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি সব সময় অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। ঘরবাড়ি, সড়ক, বাঁধ কিংবা ফসলের ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাতের হিসাব অনেক সময় নীতিনির্ধারণের আলোচনায় গুরুত্ব পায় না।

মানবাধিকারকর্মী ও স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব ক্ষতি অর্থের অঙ্কে সহজে পরিমাপ করা যায় না, আন্তর্জাতিক পরিভাষায় সেগুলোকে ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বকীয় পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও সামাজিক মেলবন্ধনের ক্ষতি।

মাধবচন্দ্র দত্তের ভাষ্য, ‘বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কিংবা সরকারি ক্ষতিপূরণ নীতিমালায় সাধারণত ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট, বাঁধ ও নষ্ট হওয়া ফসলের মতো দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়। কিন্তু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অপূরণীয় ক্ষতিগুলো নীতিমালার কাঠামোর বাইরেই রয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমাদের দায় কম হলেও আমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না।’

উপকূলের নদীকেন্দ্রিক জীবন ও লোকজ ঐতিহ্যের পরিবর্তনেও এই ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট। পরিবেশ সংগঠক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, একসময় এ অঞ্চলে প্রচলিত পৌষ-পার্বণ, নৌকাবাইচ, কবিগান, বনজীবীদের বনবিবির পূজা এবং মনসার ভেলা ভাসানোর মতো ঐতিহ্য এখন অনেক জায়গায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

অতীতে সুন্দরবনে যাওয়ার আগে বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেরা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় বনবিবির পূজা করতেন, গাইতেন বিশেষ গান। এসব আচার ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। কিন্তু জীবিকার সংকটে মানুষ পেশা ও এলাকা পরিবর্তন করায় নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য ক্রমেই অপরিচিত হয়ে উঠছে।

দাতিনাখালী এলাকার বাসিন্দা ভক্ত মুন্ডা বলেন, ‘মানুষ যখন পেটের তাগিদে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন আর গান-বাজনা বা সংস্কৃতির চর্চা থাকে না। আম্পান আর ইয়াসের পর মানুষ বেঁচে থাকার চিন্তায় এত বেশি মগ্ন যে উৎসব-পার্বণের আনন্দ উবে গেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যকার সামাজিক বন্ধন ও অকৃত্রিম সহমর্মিতাও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।’

অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু বস্তুগত সম্পদ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অভিঘাতে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের চেনা জীবনযাপন, উৎসব, পারস্পরিক নির্ভরতা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

গ্রাম ছাড়ছেন তরুণেরা, একা থাকছেন প্রবীণেরা

উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এতে একদিকে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, অন্যদিকে গ্রামে থেকে যাচ্ছেন পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’-এ প্রকাশিত গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণার বরাতে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুন্দরবন-সংলগ্ন শ্যামনগর ও কয়রা অঞ্চল থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিবারের স্থায়ী স্থানান্তরের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

গাবুরা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীন বলেন, ‘গাবুরা থেকে মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে ধারাবাহিক নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়। পাশাপাশি এলাকায় আয়ের উৎস অত্যন্ত সীমিত। আগে ধান চাষের মৌসুমে যেখানে ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো, সেখানে নোনা পানির মাছ বা চিংড়ি চাষে মাত্র একজন শ্রমিক দিয়েই কাজ চলে যায়। ফলে বাকি ১৯ জন কর্মহীন হয়ে পড়েন। তাদের অনেকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।’

তিনি জানান, জীবিকার সন্ধানে বিশেষ করে হতদরিদ্র পরিবারগুলো বেশি স্থানান্তরিত হচ্ছে। তরুণ ছেলে, তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা কাজের খোঁজে শহরমুখী হচ্ছেন। অন্যদিকে, বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা গ্রামে একা থেকে যাচ্ছেন। নিজস্ব আয় না থাকায় তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা তারা পাচ্ছেন না।

ফরিদা পারভীনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাবুরার প্রতি দশটি পরিবারের মধ্যে প্রায় দুটি পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। নদীতীরবর্তী ও দুর্গম মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই স্থানান্তরের হার বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দুর্যোগের পর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ দেওয়া হলেও তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই জনপ্রতিনিধি। তার ভাষায়, ‘দুর্যোগের পর সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে যে ত্রাণ আসে, তা প্রকৃত দুস্থদের মধ্যে বণ্টন করি। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগের পর শুধু কিছু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।’

এই বাস্তবতায় গ্রামগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রবীণদের একাকিত্ব, নিরাপত্তাহীনতা ও নির্ভরশীলতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাই উপকূলের মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ভেতরের দায়িত্ব ও সম্পর্কের ভারসাম্যও বদলে দিচ্ছে।

প্রয়োজন স্থায়ী বাঁধ, পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান

উপকূলীয় জনপদ রক্ষায় শুধু জরুরি ত্রাণ বা সাময়িক বাঁধ মেরামত যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, প্রতাপনগর ও গাবুরার মতো এলাকাকে রক্ষা করতে জিও ব্যাগের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সিসি ব্লক ব্যবহার করে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি। একই সঙ্গে জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোর খাসজমিতে পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে উপকূলীয় জনপদগুলোর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবাধিকার ও জীবিকার সংকটও। লবণাক্ততা ও ধারাবাহিক দুর্যোগের কারণে কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেয়ে এলাকা ছাড়ছেন। ফলে গ্রামে চাষাবাদ ও অন্যান্য কাজে তরুণ শ্রমিকের সংকট তৈরি হচ্ছে। যারা থেকে যাচ্ছেন, তাদের বড় অংশ প্রবীণ ও বয়স্ক মানুষ।

আশেক-ই-এলাহী বলেন, ‘৬০-৭০ বছর বয়সী প্রবীণ ও নারীদের ওপর পরিবারের দায়িত্বের চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। তারা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় কৃষি খাতে তরুণদের ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী পক্ষগুলোর কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ বা তহবিল আদায় করা হবে, তার বড় অংশ এই অঞ্চলের প্রবীণদের সুরক্ষা ও কৃষিবান্ধব সমাজ গঠনে ব্যয় করা উচিত।’

তার মতে, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও কৃষির ভিত্তি শক্তিশালী করা গেলে বাধ্যতামূলক স্থানান্তরের চাপ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে উপকূলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাও জরুরি

জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে। কর্মক্ষম সদস্যরা কাজের জন্য দূরে চলে গেলে বাড়িতে থাকা নারী ও প্রবীণদের মধ্যে একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

মনের বন্ধুর সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর সোনিয়া আক্তার পুষ্প বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কর্মক্ষম যুবকেরা শহরমুখী হওয়ায় বাড়িতে থাকা নারী ও প্রবীণদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবারের প্রধান ব্যক্তি দূরে থাকায় নারীদের পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা-মায়েরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

এই সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবারের দূরে থাকা সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং মানসিকভাবে পাশে থাকার আশ্বাস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক চাপ সামলাতে কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই কাউন্সেলর। মানসিক সমস্যাকে অবহেলা বা কুসংস্কারের চোখে না দেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনারও পরামর্শ দেন তিনি।

হারিয়ে যাওয়ার আগে রক্ষা করতে হবে উপকূলকে

সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর ও গাবুরার বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি একসঙ্গে আঘাত হানছে প্রকৃতি, জীবিকা, পরিবার ও সংস্কৃতির ওপর। নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, লবণাক্ততায় কমছে কৃষির সুযোগ, কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ এলাকা ছাড়ছে। আর এই স্থানান্তরের আড়ালে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন প্রবীণেরা, হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন।

এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের টেকসই সংস্কার ও নির্মাণ, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, কৃষি ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ, বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি—সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিকেও নীতিনির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণের আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

উপকূলের মানুষের দাবি, তাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ। তা না হলে নোনা পানিতে শুধু জমি ও বসতভিটাই হারাবে না; হারিয়ে যাবে জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা মানুষের শিকড়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)