যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

অক্টোবরের প্রথম ২৫ দিনে নিহত ২০, আহত অন্তত ৪৩

যশোরের সড়কে মৃত্যুর মিছিল

হাসপাতালে নেই নিউরোসার্জারি বিভাগ

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
যশোরের সড়কে মৃত্যুর মিছিল

যশোরে অক্টোবর মাসের প্রথম ২৫ দিনে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ জন। নিহতদের মধ্যে শিশু, কিশোর ও তরুণদের পাশাপাশি রয়েছেন নারী, বৃদ্ধ ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কা এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনায় এসব প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে নতুনহাটে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন তরুণের মৃত্যু, চৌগাছায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই কিশোরীর মৃত্যু, মণিরামপুরের রাজগঞ্জে মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে এক মা ও তার চার বছরের শিশুসন্তানের মৃত্যু স্থানীয়দের আলোড়িত করেছে।

পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল ছাড়াও বাস, ট্রাক, পিকআপভ্যান, ইজিবাইক, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন এসব দুর্ঘটনায় পড়ে। কোথাও মুখোমুখি সংঘর্ষ, কোথাও পেছন থেকে ধাক্কা, আবার কোথাও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

মোটরসাইকেলে ঝুঁকি, প্রাণ যাচ্ছে তরুণদের

গত ২৩ অক্টোবর রাতে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন তরুণ নিহত হন। ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ওমর ফারুক ও রাকিব হাসানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর আগে ২ অক্টোবর চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সড়কের দেবীপুর বালিগর্ত এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে সোলাইমান হোসেন (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হন। আহত হন তানজিল হোসেন (১৪) ও ফরহাদ রেজা নামে আরও দুইজন। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একদল বন্ধু সাতটি মোটরসাইকেলে ঘুরতে যাচ্ছিল। এ সময় একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়।

৪ অক্টোবর চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ফাসতলা এলাকায় পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্কুলছাত্র জুবায়ের হোসেন (১৫) নিহত হয়। আহত হয় তার দুই বন্ধু লিখন ও ফাহিম। তারা তিনজনই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

মুখোমুখি সংঘর্ষ ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও কম না। গত ১৫ অক্টোবর চৌগাছা-যশোর সড়কের টালিখোলা মোড়ে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে অয়ন হোসেন (২০) ও মিথিলা খাতুন (১৭) নামে দুই তরুণ-তরুণী নিহত হন। পুলিশ ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রেমিকের মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল মিথিলা। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত প্রেমিক-প্রেমিকাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক অয়নকে মৃত ঘোষণা করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মিথিলার মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ১৩ অক্টোবর চৌগাছা বাজারে ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত নুরুল আলম (৬০) নামে এক ব্যক্তি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ৬ অক্টোবর শার্শার নাভারন-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খাজুরা মসজিদের সামনে পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে আরিফ হোসেন (৩০) নামে এক হেলপার নিহত হন।

এর আগে, গত ১ অক্টোবর দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা-কামালপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ট্রাক মসজিদের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় সড়কের পাশে ঘুমিয়ে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি নিহত হন এবং ট্রাকচালক আহত হন।

এ ছাড়া ৪ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার বারীনগর বাজারে গড়াই পরিবহনের একটি যাত্রীবাসের ধাক্কায় শওকত আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। একই দিনে বাঘারপাড়ার জামদিয়া এলাকায় দুই ট্রাকের সংঘর্ষে একটি ট্রাক খাদে পড়ে চালক ও হেলপার আহত হন।

এসব ঘটনা জেলার বিভিন্ন সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ চলাচল এবং সড়কের পাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এনেছে।

শিশু ও পথচারীরাও নিরাপদ নন

গত ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মণিরামপুরের রাজগঞ্জে মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে মৌসুমি বেগম (৩২) ও তার চার বছরের ছেলে আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন মৌসুমির স্বামী ওমর ফারুক। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পিকআপের ধাক্কায় মা ও শিশু সড়কে পড়ে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাছবাহী পিকআপ ভ্যান তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলে মৌসুমির মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় শিশুটি। আহত হন ওমর ফারুক। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পরদিন বাড়িতে ফিরে স্ত্রী ও সন্তানকে দাফন করেন ওমর ফারুক।

১৯ অক্টোবর ঝিকরগাছার মাগুরা ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকায় ভ্যান ও গরুবোঝাই নসিমনের সংঘর্ষে একই পরিবারের দুই শিশু শোভন (১০) ও দিশা (৩) নিহত হয়। পূজা দেখতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদের পরিবার। এ ঘটনায় শিশু দুটির বাবা কলেজশিক্ষক সাধন কুমার, মা, নসিমনের চালক ও এক যাত্রী আহত হন।

১০ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার কচুয়া এলাকায় বাড়ির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের ধাক্কায় আহত ছয় বছরের শিশু সাজিদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ৪ অক্টোবর পুলেরহাট বাজার এলাকায় বাসের ধাক্কায় আহত বাইসাইকেল আরোহী সুলতান (৬০) চিকিৎসাধীন অবস্থার মারা যান।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছেন

হাসপাতালে আসা সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বড় অংশই তরুণ বলে জানিয়েছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবীর বাপ্পী। তার মতে, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, তরুণদের অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়কের অবস্থাও দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের মধ্যে মাথায় আঘাতের ঘটনা বেশি দেখা যায়। অনেক রোগীকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, আবার গুরুতর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজন হয়। কারণ এই হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগ না থাকায় সার্জারি ও অর্থোপেডিকস বিভাগের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায়।

তিনি বলেন, সম্প্রতি যশোর শহরতলীর চাঁচড়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজন হয়।

সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর ভাষ্য

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু সড়ক নির্মাণ ও গতিনিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো তৈরি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা। তার মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সওজ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), হাইওয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শাম্মী সুলতানা বলেন, সড়কে ট্রাফিক সাইন, সংকেত ও প্রয়োজনীয় গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা সওজের কাজের অংশ। অন্যদিকে চালকদের লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস যাচাই বিআরটিএর দায়িত্ব, চালকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে বিআরটিসি যুক্ত এবং সড়কে আইন প্রয়োগ ও নিয়ম ভঙ্গের বিষয়গুলো দেখভাল করে হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তিনি জানান, দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও দুর্ঘটনার প্রবণতা শনাক্ত করার কাজ সওজের বিভাগীয় পর্যায় ও অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে করা হয়। যশোর-মাগুরা সড়কের সওজের আওতাধীন প্রায় সাত কিলোমিটারের বিভিন্ন অংশে সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত স্থাপনের কাজ করা হবে।

বিআরটিএ’র অভিমত

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালক, যানবাহনের মালিক, যাত্রী ও পথচারী—সব পক্ষের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) ও অফিসপ্রধান মোহাম্মদ জমির হোসেন। তিনি বলেন, চালকদের বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালানোর আগে সন্তানদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে গেল শুক্রবার রাতে তিনজনের প্রাণহানির দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে জমির হোসেন বলেন, একটি মোটরসাইকেলে তিনজন আরোহী থাকা এবং অতিরিক্ত গতিতে চলার বিষয়টি দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনায় এসেছে। তার ভাষ্য, উচ্চগতিতে চলার সময় হঠাৎ পরিস্থিতি তৈরি হলে চালক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

জেলা পুলিশের বক্তব্য

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। ফিটনেসবিহীন ও নিবন্ধনহীন যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা এবং মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার না করার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনা কমাতে পুলিশের পাশাপাশি চালক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

তিনি বলেন, সড়কে বাস, ট্রাক, মিনিবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যানবাহনের চাপ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তরুণ ও কম বয়সী চালকদের মধ্যে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

মিরাজুল ইসলাম বলেন, অনেক দুর্ঘটনা ফাঁকা সড়ক বা মোড়ের কাছে ঘটছে, যেখানে চালকেরা দ্রুতগতিতে যানবাহন চালান। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করার সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তরুণদের মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার আগে ভালো প্রতিষ্ঠানে যথাযথভাবে চালানো শেখানো, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সতর্ক করা প্রয়োজন। তার মতে, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ ও সবার সচেতনতাই সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)