স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
বৈশাখের তৃতীয় দিন বৃষ্টির পর এক চিলতে শীতল পরশ মিললেও, গত কয়েকদিন ধরে যশোরে আগুনের হলকা বইছে। তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রখর রোদ, অন্যদিকে আর্দ্রতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও পেটের পীড়াসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
জেলায় বর্তমানে হিট স্ট্রোক, জ্বর, চোখ ওঠা ও জন্ডিসের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তাই চিকিৎসকরা বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু জীবিকার তাগিদে তপ্ত রোদে ঘাম ঝরানো শ্রমজীবী মানুষের সেই উপায় নেই। ফলে, অনেকেই পানিশূন্যতা ও ‘লু’ লেগে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের চিত্র আরও ভয়াবহ। মেডিসিন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীর ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায়। গরমে গাদাগাদি করে থাকায় সুস্থ হতে আসা মানুষ উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে দ্রুত এসির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন উদ্বিগ্ন স্বজনরা।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী, অন্তর্বিভাগে ভর্তি হয়ে জ্বর, সর্দি, কাশিতে মোট ১৭১জন শিশু, নারী ও পুরুষ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। এরমধ্যে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছে ১৮২জন।
ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সিনিয়ার স্টাফ নার্স সুমাইয়া আক্তার বলেন, গত দুইদিন গরমের তীব্রতা বেশি হওয়ায় শিশু, খেটে খাওয়া মানুষ ও বৃদ্ধরা জ্বর, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই রোগীর চাপ অতিরিক্ত হওয়ায় সেবা দিতেও সমস্যা হচ্ছে।
যশোর সদরের এড়েন্দা গ্রামের হালিমা বেগম জানান, গত দুদিন তার তীব্র জ্বর। প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট দিয়েও জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসায় হাসপাতলে ভর্তি হয়েছি।
এদিকে, সুস্থ থাকতে বিশেষ সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন যশোর মেডিকেল কলেজের (মেডিসিন বিভাগের) রেজিস্ট্রার ডাক্তার এএইচএম মঞ্জুর উদ্দিন। তিনি বলেন, তীব্র গরমে মূলত শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ায় অসুস্থতা দেখা দেয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হিটস্ট্রোক এটি প্রাণঘাতী। শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে মানুষের হিটস্ট্রোক হয়। এছাড়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীর ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ডায়রিয়া ও জন্ডিসের প্রকোপ বাড়ে। অতিরিক্ত গরমের কারণে মাংসপেশিতে টান লাগা বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।
যশোর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার আকাশ মেঘলা থাকলেও ভ্যাপসা গরমে দুপুরে তাপমাত্রা ৩৬.৪ থেকে ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। এসময় অনুভূত হয় ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। অসহনীয় এই গরম আরও কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন শাফায়াত বলেন, গত দুই দিনে যশোরের তাপমাত্রা একটু বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে ও পরিবারকে সুস্থ রাখতে হলে, প্রচুর পানি পান করতে হবে। তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৮/১০ গ্লাস বা ৩/৪ লিটার নিরাপদ পানি পান করতে হবে। এছাড়া, তরল খাবারের মধ্যে ডাবের পানি, লেবুর শরবত, বাসায় তৈরি ফলের রস ও খাবার স্যালাইন খেলে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় থাকবে। তিনি আরো বলেন, গরমের মধ্যে অতিরিক্ত তেল-মশলা ও ভাজাজাতীয় খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। সহজে হজম হয় এমন খাবার যেমন, শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে।
ওয়ার্ডে এসির বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য কমিটির মিটিংয়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি।