চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি
যশোরের চৌগাছা থানার এসআই ইমরান হোসেন রাজুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।
সবশেষ রোববার এক ইউপি মেম্বারের বাড়িতে প্রবাসীর স্ত্রীসহ আটকের ঘটনায় গ্রামের মুরব্বিদের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। অবশ্য, এসআই রাজু তার বিরুদ্ধে আনীত প্রত্যেক অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।
তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আটকে মাদক ব্যবসায়ীর মাদকের টাকা উদ্ধার, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া, অপহরণ ও ধর্ষণ মামলার বাদীপক্ষের কাছ থেকে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের কুলিয়া গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী মিয়াজান জগন্নাথপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শিহাব উদ্দিনের কাছ থেকে একটি ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল কেড়ে নেয়। মে মাসের প্রথমদিকে শিহাব উদ্দিন মোটরসাইকেলটি উদ্ধারে চৌগাছা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত মিয়াজান তার ব্যবহৃত পালসার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো-ল-৬০-৪৯১২) জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।
অভিযোগ পেয়ে ইমরান হোসেন রাজুকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেন ওসি মামুনুর রশীদ। অভিযোগের একদিন পরেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে চৌগাছা থানায় নিয়ে যান এসআই রাজু ও এএসআই আব্দুর রহমান শান্ত। এরপর অভিযোগকারীকে মোটরসাইকেল নেওয়ার জন্য বলেন। তিনি মোটরসাইকেল নিতে থানায় গেলে এসআই রাজু তার কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি। তিনি ১৫ হাজার টাকা দিতে চাইলে তিনি রাজি হননি। এমনকি অভিযোগকারীকে আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে মামলায় চালান দেওয়ার ভয় দেখান এবং ঘোরাতে থাকে থাকেন। এভাবে ১৫ দিন চলতে থাকে। পরবর্তীতে থানায় সালিশের মাধ্যমে মোটরসাইকেলটি তদবিরকারী একজনের কাছে দেওয়া হয়। উদ্ধারের কয়েকদিন পর এসআই রাজু তদবিরকারী মিঠুকে দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প দেখিয়ে জানান, মোটরসাইকেলের মালিকানা ঢাকার একজনের। পরে বলেন, মোটরসাইকেল মাদক ব্যবসায়ী মিয়াজানের।
স্ট্যাম্পগুলো দেখে ও মোটরসাইকেলের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে থানার ওসি মামুনুর রশীদ এসআই রাজুকে উদ্ধার মোটরসাইকেল জব্দমূলে আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। তবুও এসআই রাজু এবং এএসআই শান্ত স্থানীয়ভাবে থানায় বসে সালিশ করে মোটরসাইকেলটি মাদক ব্যবসায়ী মিয়াজানের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিহাবের কাছে মিয়াজান মাদক বিক্রির ২০ হাজার টাকা পাবেন। সেই টাকা আদায় করতে শিহাবের কাছ থেকে মোটরসাইকেল কেড়ে নেন। তবে মোটরসাইকেলটির মূল মালিক ঢাকার বাসিন্দা।
অভিযোগ উঠেছে, এসআই রাজু এবং এএসআই আব্দুর রহমান শান্ত ওই মাদক ব্যবসায়ী মিয়াজানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন।
এছাড়া, তাদের বিরুদ্ধে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, গত ১৫ মে সিংহঝুলি গ্রামের আব্দুল হালিম মল্লিক নামে এক ব্যক্তি ‘তার মেয়ে অপহরণ হয়েছে’ মর্মে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটি তদন্ত করে মেয়েটিকে উদ্ধার করার জন্য থানার ওসি ইমরান হোসেন রাজুকে নির্দেশ দেন। এরপর তিনি মেয়েটিকে অনুসন্ধানে বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালান। পরবর্তীতে ঈদের পরদিন ২৯ মে ছেলেপক্ষ মেয়েকে নিজের থেকেই থানায় দিয়ে যায়। তবুও এই বিষয়ে মেয়েটিকে উদ্ধারে মেয়েপক্ষের কাছ থেকে তিনি দশ হাজার টাকা উৎকোচ নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ রোববার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়িয়ালী গ্রামের এক প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে তিন নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাজু আহমেদকে (৩৮) আপত্তিকর অবস্থায় ধরে গ্রামবাসী দশপাখিয়া পুলিশ ক্যাম্পে সংবাদ দেন। এরপর ক্যাম্প পুলিশ ও থানার জরুরি ডিউটি পার্টির ইনচার্জ ইমরান হোসেন রাজু ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি ইউপি সদস্য রাজু আহমেদের পক্ষ নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মুরব্বিদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। তাদের ‘জেলের ভাত খাওয়ানোর’ হুমকি দেন এবং আটক রাজু মেম্বার ও প্রবাসীর স্ত্রীকে মীমাংসার জন্য নিয়ে যেতে চান। তখন মুরব্বিরা তাদের নিয়ে যাওয়ার কোনো ডকুমেন্ট রেখে যেতে বললে তিনি তাদের মামলার আসামি করার হুমকি দিয়ে চলে যান। পরবর্তীতে ওয়ার্ড বিএনপি নেতা ওসমান গনির মধ্যস্থতায় প্রবাসীর স্ত্রীকে তার বাবার বাড়ি পাঠানো ও মেম্বারকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে, এসআই ইমরান হোসেন রাজু ঝিকরগাছা থানায় থাকাকালে তার বিরুদ্ধে শিওরদাহ গ্রামের মুর্শিদা আক্তার রেনুকা (২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে) যশোরের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এসআই রাজুর বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদানে অনিয়ম, হয়রানি ও টাকা গ্রহণের অভিযোগ এবং অভিযোগকারীর মেডিকেল সনদ পরিবর্তন করে হাসপাতাল থেকে ভুয়া মেডিকেল সনদ নিয়ে অভিযুক্তদের পক্ষে তদন্ত রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এসআই রাজুকে চৌগাছা থানায় পোস্টিং দেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই রাজু সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘প্রবাসীর স্ত্রী-মেম্বার আটকের ঘটনায় গ্রামের লোকজন তাদের হাতে তুলে দিতে বলেন। কিন্তু আমরা সেটা করিনি। পরে স্থানীয়রা বসে মীমাংসা করবে জানালে ওসি স্যারের সাথে কথা বলে আমরা ফিরে আসি। কাউকে মামলায় ফাঁসানোর কথা বলিনি।’
মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।’
তিনি বলেন, ঝিকরগাছার শিওরদাহ গ্রামের মুর্শিদা আক্তার রেনুকার অভিযোগ ঠিক না। কেননা ঘটনার সত্যতা না পেয়ে আমি চার্জশিট দিয়েছিলাম। তারা নারাজি দিলে বিষয়টি পিবিআই তদন্ত করেও একই রিপোর্ট দেয়। এখানেও তারা নারাজি দিলে বিষয়টি সিআইডির তদন্তাধীন রয়েছে।