বিশ্বকাপ উন্মাদনা
ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে পরিচিত ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। বিশ্বমঞ্চের এই মহাসমরকে কেন্দ্র করে যশোরের ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। বিশ্বকাপের এই জোয়ারে সবচেয়ে বড় হাওয়া লেগেছে জার্সির বাজারে। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে খেলা দেখার চিরচেনা বাঙালি আবেগ এবারও ফিরে এসেছে।
যশোরের বিভিন্ন শপিং মল ও স্পোর্টস মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।
চিরচেনা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ
বরাবরের মতো এবারও মাঠের বাইরে মুখোমুখি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। কেউ আসছেন নিজের জন্য, কেউবা আসছেন সন্তানের জন্য জার্সি কিনতে। আবার অনেকে আসছেন সন্তানসহ।
আর্জেন্টাইন সমর্থক সজীব বিশ্বাস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মেসির খেলা দেখে আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। এবারও জার্সি কিনেছি, বাসায় পতাকাও টানিয়েছি। আশা করি এবার কাপ আমরাই নেবো।’
একই সুর শোনা গেল নিরঞ্জন সরকারের কণ্ঠেও। ম্যারাডোনার নাম শুনে বড় হওয়া নিরঞ্জন এখন মেসির প্রেমে মগ্ন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘এবার যে টিম, তাতে বিশ্বকাপ নিশ্চিত আমাদের।’
পিছিয়ে নেই ব্রাজিলের সমর্থকরাও। বাজারে ছেলের জন্য জার্সি কিনতে আসা আনিসুল হক বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে আগের মতো ফুটবল বিশ্লেষণ করা হয় না। তবে যেহেতু ব্রাজিলের সমর্থক, তাই চাইবো কাপটা তারাই নিক।’
তরুণ মিনহাজ ও জাহিদের পছন্দের মূল কারণ নেইমারের ফুটবল জাদু। মিনহাজ জানান, নেইমারের স্কিল দেখার জন্য তিনি রাত জেগে খেলা দেখেন এবং ইতোমধ্যে জার্সিও কিনে ফেলেছেন।
কাকার খেলা দেখে শৈশবে ব্রাজিলের প্রেমে পড়া চয়ন এবার দল নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী না হলেও চাইছেন ভালো কিছু হোক।
সমীকরণ পাল্টাচ্ছে অন্য দলগুলোও
চিরাচরিত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা রেষারেষির বাইরে এবার অন্যান্য দলের প্রতিও ঝোঁক বেড়েছে যশোরবাসীর। বিশেষ করে জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় বাজারে পর্তুগালের জার্সির চাহিদা আছে।
তবে, আদর্শিক ও মানবিক কারণে দল পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ দেখা গেল ক্রেতা সাইফুল ইসলামের মধ্যে। তিনি বলেন, ‘আগে আর্জেন্টিনা করতাম। কিন্তু বর্তমানে ফিলিস্তিন ইস্যুতে স্পেনের অবস্থান এবং স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সাহসী ভূমিকার কারণে এবার আমি স্পেনকে সাপোর্ট করছি।’
এদিকে, ফরহাদ হোসেন শাওন নামের এক ফুটবলপ্রেমী জানান, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকায় তিনি নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থক না হলেও গতবার মেসি এবং এবার রোনালদোর কারণে পর্তুগালকে সমর্থন করছেন। তার মতে, এবার যশোরবাসীর বিশেষ নজর থাকবে বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে হতে যাওয়া আমেরিকা বনাম ইরানের টানটান ম্যাচটির দিকে।
বাজারে জার্সি সংকট ও চড়া দাম
চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও কাপড়ের দাম এবং উৎপাদন সংকটের কারণে জার্সির দাম এবার কিছুটা চড়া বলে জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ৬৫০ টাকা থেকে শুরু করে ভালো মানের জার্সির দাম দেড় হাজার, দুই হাজার বা তারও বেশি। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক ক্রেতা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
‘সুজন স্পোর্টস’-এর মালিক আবির উদ্দিন খান জয় বলেন, বেচাকেনা বেশ ভালো। পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্সের জার্সির চাহিদাও এবার ব্যাপক। তবে, সিজন অনুযায়ী বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে কিছুটা বেশি দামে।
‘স্পোর্টস পয়েন্ট’-এর ব্যবস্থাপক মামুন হোসেন জানান, জিরো সাইজ থেকে শুরু করে মুরুব্বিদের জার্সিও বিক্রি হচ্ছে। তবে, অন্যান্য বারের চেয়ে এবার জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল ও ইরানের জার্সি ও পতাকার চাহিদা বেড়েছে।
ব্যবসায়ী সুজন গাজী শিশুদের জার্সির সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ফ্যাক্টরি থেকে পর্যাপ্ত প্রোডাকশন না দেওয়ায় এবার দাম প্রায় দ্বিগুণ। কাস্টমারদের চাহিদা অনুযায়ী মাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’
একনজরে জার্সির দরদাম
লোকাল মান: ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, ফ্যান এডিশন: ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা, প্লেয়ার কপি: ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা, প্লেয়ার এডিশন: ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা
শিশুদের জার্সি: ২০০ টাকা থেকে শুরু (মানভেদে দ্বিগুণ পর্যন্ত)
পতাকা (৩ থেকে ৩.৫ ফুট): ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, (৫ ফুট): ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, (১০ ফুট): ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা
জার্সি ও পতাকার পাশাপাশি বাজারে ফুটবল, বুট এবং বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের বিক্রিও জমজমাট হতে শুরু করেছে।