নড়াইল প্রতিনিধি
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি বেতন-ভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে পীযূষকান্তি ঘোষ নামে এক কম্পিউটার শিক্ষকের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ে পাঠদান তো দূরের কথা, একদিনের জন্যও তিনি সেখানে পা রাখেননি। অথচ, নিয়মিত তার ব্যাংক হিসাবে ঢুকেছে সরকারি টাকা (এমপিও)।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
তবে, পীযূষকান্তি ঘোষের দাবি, ২০০৯ সালেই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তার ব্যাংক হিসাবে কীভাবে টাকা ঢুকছে, তা তিনি জানেন না।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের কারসাজিতেই দীর্ঘদিন ধরে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য, একে অপরের প্রতি দোষারোপ করে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ওই বিষয়ে পাঠদানের জন্যে নেই কোনো শিক্ষক। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিদ্যালয়টির শত শত শিক্ষার্থী। অথচ কম্পিউটার শিক্ষক পদে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিদ্যালয়ে না থেকেও বেতনসহ সরকারি সব সুবিধা পাচ্ছেন এক শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৬ সালে দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষকের শূন্য পদে পীযুষ কান্তি ঘোষ যোগদান করেন। তিন বছর চাকরি করেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালে তিনি ঢাকায় গিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হন। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও অদৃশ্য কোনো এক ক্ষমতাবলে এমপিওভুক্ত হন শিক্ষক পীযুষ। সেই থেকে একটিবারের জন্যও বিদ্যালয়ে যাননি তিনি। অথচ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ (এমপিও) হিসেবে প্রায় অর্ধকোটি টাকার সুবিধা ভোগ করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত।
শিক্ষক পীযূষকান্তি ঘোষের ব্যাংক হিসাবের (স্টেটমেন্ট) সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জন কুমার বসু (১৯৮৪-২০১২), এরপর অনন্ত কুমার বিশ্বাস (২০১২-২০১৪), তুষার কান্তি ঘোষ (২০১৪-২০২২), গোলক চন্দ্র বিশ্বাস (২০২২-২০২৫) এবং সবশেষ তুষারকান্তি ঘোষ (২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে অদ্যাবধি) দায়িত্ব পালন করেন। পীযূষকান্তির বেতন উত্তোলনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। চলতি বছরের জুনেও শিক্ষক পীযূষকান্তির ব্যাংক হিসাবে টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়টির অবসরপ্রাপ্ত দুই প্রধান শিক্ষক নীরঞ্জন কুমার বসু এবং অনন্ত কুমার বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আড়াই বছর দায়িত্বে থাকা বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক) এবং বর্তমান প্রধান শিক্ষক একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন।
সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলকচন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আড়াই বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন কম্পিউটার শিক্ষক পীযূষের বেতন বন্ধ রাখি। প্রধান শিক্ষক পুনর্বহাল হয়ে আবারও তার বেতন চালু করেন।’
ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী তার দায়িত্বকালে পীযূষের অ্যাকাউন্টে বেতন ঢুকেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো আবেদন করিনি, তবে কীভাবে ঢুকছে আমার জানা নেই।’
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক তুষারকান্তি ঘোষ অনুপস্থিত শিক্ষকের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ও উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে পীযূষকে নোটিস করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হাইকোর্টের এক রায় অনুযায়ী বরখাস্ত করলেও তার প্রাপ্য টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। আমাকে অপবাদ দিয়ে চক্রান্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। সেই আড়াই বছরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলক পীযূষের বেতন চালু রেখেছিল। আমি যোগদান করে তার দেখানো পথে পীযূষের বেতন তিন মাস চালু রাখি, পরে আবার বন্ধ করে দিই।’
তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষকদের বেতন চালুর বিষয়ে কমিটির সিদ্ধান্তের বাইরে প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তৎকালীন কমিটির সিদ্ধান্তে তিনি বেতন চালু রাখতে বাধ্য হন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পীযূষকান্তি ঘোষ বলেন, ‘২০০৯ সালে স্কুলের চাকরি ছেড়ে এসেছি। বিদ্যালয়ে আর কখনো যাইনি। তবে, এসব বেতন উত্তোলন ও এমপিওর বিষয়টি সম্প্রতি বিভিন্ন মারফতে জানতে পেরেছি। এসব টাকার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’
তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘দীর্ঘ এতো বছরে ব্যাংকে আমি কখনো যাইনি। কীভাবে আমার অ্যাকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে, কখনো ব্যাংক থেকেও আমার সাথে যোগাযোগও করা হয়নি। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, ‘একটি অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত থেকেও শিক্ষক পীযূষ সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন, যেটি গর্হিত অপরাধ। আর একজন শিক্ষকের একার পক্ষে এ কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। আমি সম্প্রতি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছি। তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন সব দপ্তরে বিষয়টি জানাবো। আশা করি, এই চক্রের সকলের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৪০১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরের বছর এমপিওভুক্ত হয় এটি।