শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসতেই যশোরে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৭৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। তবে, ২০২২ থেকে অদ্যাবধি গত চার বছরে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আট হাজার ৬৫০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭০৭ জনে।
সংক্রমণের উচ্চমাত্রার কারণে একাধিকবার যশোর সদর ও অভয়নগর উপজেলাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যশোর সদর, অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত শুরু হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৭৫ জন। এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৩ জন, যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন পাঁচজন এবং বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনজন। এছাড়া ১৩ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না নিয়ে চলে গেছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় (৭ জুলাই সকাল আটটা থেকে ৮ জুলাই সকাল আটটা) জেলায় নতুন করে আরও তিনজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বুধবার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৩ জন রোগী। এর মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে একজন ও অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১২ জন।
ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ৪ জুলাই সোহেল হোসেন (২৯) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে জেলায় ডেঙ্গুতে এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পথে সোহেলের মৃত্যু হয়।
তিনি যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া মডেল কলেজ এলাকার সৌদিপ্রবাসী জুয়েল হোসেনের ছেলে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে জুন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছিলেন মাত্র ৯৩ জন। চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৫ জন। অথচ, ১০ জুন পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন ৮৫ জন। মাত্র ২৮ দিনে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৯০ জন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গত বছরের মাসভিত্তিক হিসাব আরও উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আক্রান্ত হন ১৬৪ জন, আগস্টে ১৭৮ জন, সেপ্টেম্বরে ২০৯ জন, অক্টোবরে ৩৩২ জন এবং নভেম্বরে ৩২২ জন। ডিসেম্বর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ জনে। অর্থাৎ, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসেই আক্রান্ত হয়েছিলেন এক হাজার ২০৫ জন। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ই ডেঙ্গু সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান বিবেচনায় রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হবে এবং অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।
অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব বলেন, অভয়নগর অতীতেও ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমরা শুরু থেকেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও যাতে দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়, সেই সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অভয়নগরের একটি বড় অংশ বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধ থাকে। পাশাপাশি মোংলা-বেনাপোল করিডোর, শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দরকেন্দ্রিক এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত হয়। এসব কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছি।’
ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, এখন পর্যন্ত জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে, অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিককে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগী শনাক্তকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা বা অব্যবহৃত যেকোনো পাত্রে যেনো পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।
ডেঙ্গু রোগে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু টানা জ্বর, শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি, পেট ব্যথা বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দেরি হলে জটিলতা বাড়তে পারে।
এদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে বর্তমানে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া অব্যাহত রয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ৮ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে একজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪৫ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ৩৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ সময়ের মধ্যে হামে কারও মৃত্যু হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, যাতে রোগটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।