শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে যানজট নিরসন, যাত্রীসেবা নিশ্চিতকরণ এবং পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পৌর বাস টার্মিনালটি কার্যত অচল পড়ে আছে।
এই অবকাঠামো জনসেবায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। দুই দফা উদ্বোধনের পরও নিয়মিতভাবে কোনো যাত্রীবাহী বাস এখান থেকে চলাচল করছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, বেনাপোল পৌরসভার কাগজপুকুর এলাকায় নির্মিত বাস টার্মিনালের বিশাল চত্বর প্রায় জনশূন্য। যাত্রী ছাউনি, বাস কাউন্টার, পার্কিং এলাকা, অভ্যন্তরীণ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও সেখানে নেই যাত্রীদের কোলাহল কিংবা বাসের সারি। মাঝে মধ্যে দু-একটি বাস দেখা গেলেও অধিকাংশ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। অন্যদিকে, নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন পুরনো চেকপোস্ট এলাকায় আগের মতোই যাত্রী ওঠানামা ও বাস অবস্থান করায় প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অচল পড়ে থাকায় টার্মিনালটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে মানুষের চলাচল না থাকায় অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের প্রধান স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াত করেন। একইসঙ্গে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক এই বন্দর ব্যবহার করে। নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন চেকপোস্ট এলাকায় যাত্রীবাহী বাস প্রবেশ করায় যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় প্রায়ই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এ কারণে চেকপোস্ট, বেনাপোল বাজার ও আশপাশের এলাকায় জনদুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা।
এই সমস্যা সমাধানে বেনাপোল পৌরসভা শহরের প্রবেশমুখ কাগজপুকুর এলাকায় আধুনিক বাসটার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বেনাপোল পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পৌর বাস-ট্রাক টার্মিনাল, পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ও দুই কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রথমে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে আরও ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করা হয়।
২০১৭ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। ২০১৮ সালের মে মাসে নির্মাণকাজ শুরু হলেও অর্থসংকটে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে নির্মাণকাজ শেষ হলেও টার্মিনালটি কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বেনাপোল পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. কাজী নাজিব হাসান। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের নির্দেশনায় ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর নতুন করে টার্মিনালটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কয়েকদিনের জন্য বাস চলাচল শুরু হলেও মাত্র সাতদিনের মাথায় আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায়। বর্তমানে কৌশল হিসেবে টার্মিনালে দু-একটি বাস রাখা হলেও অধিকাংশ বাসই পুরনো চেকপোস্ট টার্মিনাল ব্যবহার করছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন টার্মিনাল চালু হলে চেকপোস্ট এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশে কমতো। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অনাগ্রহ এবং বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্যের কারণে বাসগুলো এখনো পুরনো টার্মিনালেই যাতায়াত করছে। এতে একদিকে যেমন যানজট কমছে না, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগও কার্যত অকার্যকর হয়ে রয়েছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকারি এই স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে।
টার্মিনালটি চালু না হওয়ায় প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি। বাস কাউন্টার, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, ফার্মেসি, যাত্রীসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে ওঠার কথা থাকলেও তা হয়নি। এতে স্থানীয় অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বেকার যুবকের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জহির আহমেদ বলেন, প্রতিদিন যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালটি ব্যবহারই করা হচ্ছে না।
ব্যবসায়ী রায়হান হোসেন বিল্লাল বলেন, টার্মিনাল চালু থাকলে চেকপোস্ট এলাকায় চাপ কমতো। এখন সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তি পোহাচ্ছে। ইজিবাইকচালক আরিফ হোসেন বলেন, বাসগুলো একসঙ্গে চেকপোস্ট এলাকায় দাঁড়ালে পুরো রাস্তা আটকে যায়।
বেনাপোল আমদানি রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, পৌরসভা, পুলিশ, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত সমন্বয় বৈঠক করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। প্রয়োজনে প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে সব দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা বাসের জন্য নতুন টার্মিনাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হোক। টার্মিনালে নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত পুলিশি টহল, সিসিটিভি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার।
যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য মাও. আজিজুর রহমান বলেন, বেনাপোলে দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও নাগরিক ভোগান্তির বিষয়টি দেখছি। জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো সরকারি স্থাপনা বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকা কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পৌরসভা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস টার্মিনালটি কীভাবে কার্যকরভাবে চালু করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।