সাইফুল ইসলাম কবির
, বাগেরহাট
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দশ জেলায় ৫৬ হাজার ৭৪৮ কৃষকের ৪১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
খুলনার রূপসা উপজেলার ইলাইপুর গ্রামের ইউসুফ মিনার ছেলে মো. ছলেমান মিনা ১৯৯২ সালে কৃষি ব্যাংক থেকে মাত্র ছয় হাজার টাকা ঋণ নেন। সময়ের ব্যবধানে সুদ-আসলে সেই ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় দশ হাজার টাকায়। ব্যাংকের চাপে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধের পরও তার নামে বকেয়া ছিল পাঁচ হাজার ৩৮ টাকা। একই এলাকার সামছুর রহমান ১৯৯০ সালে সাত হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বর্তমানে ১২ হাজার ১৭১ টাকা এবং তালিমপুর গ্রামের মোমিন উদ্দীন ১৯৮৯ সালে ছয় হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বর্তমানে ১১ হাজার ৭৭৪ টাকা দেনার দায়ে ছিলেন। প্রায় তিন যুগ ধরে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ানো এসব কৃষক অবশেষে মুক্তি পাচ্ছেন সেই দায় থেকে।
শুধু ছলেমান, সামছুর রহমান বা মোমিন উদ্দীন নন; কৃষিঋণ মওকুফের সুবিধা পাচ্ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দশ জেলার মোট ৫৬ হাজার ৭৪৮ জন কৃষক।
কৃষি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব কৃষকের মোট ৪১ কোটি ৭৯ লাখ ৫৬ হাজার ২৫৬ টাকার ঋণ মওকুফ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বকেয়া ঋণ থেকে মুক্তির খবরে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
কৃষি ব্যাংক সূত্র জানায়, নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত যেসব কৃষকের কৃষিঋণের স্থিতি দশ হাজার টাকার মধ্যে ছিল, তারাই এ সুবিধার আওতায় এসেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় কৃষি ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকের খুলনা জোনাল অফিসের আওতাধীন বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও নড়াইল জেলায় ৩০ হাজার ২৪৮ জন কৃষকের ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকার ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কুষ্টিয়া জোনের আওতাভুক্ত কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ২৬ হাজার পাঁচশ’ কৃষকের ২০ কোটি ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার ২৫৬ টাকার ঋণ মওকুফের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি ব্যাংকের কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক উৎপল কবিরাজ।
তিনি বলেন, দশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহণকারী কৃষকদের তালিকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তাদের ঋণমুক্ত ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হস্তান্তর করা হবে।
খুলনা জেলা কৃষি ব্যাংক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা মিলিয়ে ছয় হাজার ৭৬৭ জন কৃষকের চার কোটি ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৪২৫ টাকার ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী ডুমুরিয়া উপজেলার দুই হাজার ৭১১ জন কৃষক। এ উপজেলায় মওকুফকৃত ঋণের পরিমাণ এক কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৮৫৫ টাকা। এছাড়া কয়রায় এক হাজার ৪৪৮ জন কৃষকের এক কোটি পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার ১১০ টাকা, ফুলতলায় ৬৭৩ জনের ৪৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬৩৩ টাকা, রূপসায় ৬২১ জনের ৪১ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৩ টাকা এবং পাইকগাছায় ২৯৫ জনের ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৬ টাকার ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
তবে, কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দশ হাজার টাকার বেশি ঋণধারীরা এ সুবিধার আওতায় আসছেন না। অন্যদিকে নির্বাচনের পর খুলনা জোনের আওতাধীন পাঁচ জেলায় নতুন করে প্রায় দুই লাখ তিন হাজার কৃষক ঋণ নিয়েছেন, যার মোট পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ছয়শ’ কোটি টাকা।
ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঋণ মওকুফের বিষয়টি ইতোমধ্যে সুবিধাভোগীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় যেসব কৃষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছিল, সেসব মামলাও প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।