কাজী আশরাফুল আজাদ
, যশোর
‘‘বৃষ্টি নামলেই মনে পড়ে প্রিয়র কথা। চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। বুকটা ফেটে যায়। এই সেই জুলাই মাস, সে সময়ও (২০২৪ সাল) বৃষ্টি হতো। বৃষ্টির মধ্যেই প্রিয় যেতো আন্দোলনে। আর বলতো, ‘ছাত্রদের নায্য আন্দোলনে যাচ্ছি। যদি শহীদ হই, এর মতো মর্যাদা আর কিছুতে হবে না।’’
চোখের পানি মুছতে মুছতে সুবর্ণভূমিকে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্র শাওয়ান্ত মেহতাব প্রিয়র মা রেহেনা পারভীন কুইন।
২০২৪ সালে জুলাই মাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যশোরে যে ক’জন শহীদ হয়েছিলেন, তাদের অন্যতম এই শাওয়ান্ত মেহতাব প্রিয়।
প্রিয়র বাবা-মা প্রায় আট বছর ধরে যশোর শহরের মুজিব সড়কের জনৈক লালনের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ওই বাড়ি থেকে আন্দোলনে যেতেন প্রিয়। মাত্র ১৮/১৯ বছর বয়স ছিল তার। সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড পেয়েছিলেন। ২০২২ সালে জিলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পান প্রিয়। মেধারী ছাত্র প্রিয়র ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে বাবাকে অবসরে পাঠিয়ে নিজেই সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার। ছোট দুই ভাই আসওয়াদ মুনির আদর নবম, আর দাইয়ান মাহাদী অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা শাকিল ওয়াহিদ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক।
বাবা-মা জানালেন, প্রিয় প্রথমদিকে আন্দোলনে যেতো না। পরে পুলিশের অ্যাকশনে একের পর এক শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের পর সে রাস্তায় নামে। মিছিলে গেলে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কার কথা বললে প্রিয় বাবা-বায়ের উদ্দেশে বলতো ‘তোমরা এতো ভীতু কেন? ভিতু বাবা-মা থাকলে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হতো না। আমি যদি শহীদ হই, হবো। শহীদের মর্যাদার ওপর আর কিছু নেই। দেশের মানুষ সারা জীবন মনে রাখবে।’
‘প্রতিদিন মিছিলে যেতো আন্দোলনের সময়। বলতো সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার মধ্যে ফিরবো। ও যা বলতো তাই করতো। সঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতো। আর মায়ের সাথে যোগাযোগ থাকতো সব সময়।’
প্রিয়র বাবা শাকিল মেহতাব বলেন, ‘ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে বাড়ি থেকে ছেলে বের হয়ে যায়। বলে, রাত সাড়ে ৮টার মধ্যে ফিরবে। বিজয় মিছিলে অংশ নেবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান নেতা রাশেদ খানের প্রিয় সংগঠক ছিল প্রিয়। সব সময় তার সাথে থাকতো। শহরে বের হওয়া সব মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতো।’
শাকিল ওয়াহিদের ভাষ্য, ‘ঘটনার দিন (৫ আগস্ট ২০২৪) প্রিয় সন্ধ্যার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়। রাত ১০টা বাজার পরও যখন ফেরেনি তখন প্রিয়র বন্ধু নাহিদের বাড়িতে যাই। কিন্তু সে তেমন কিছু বলতে পারেনি। রাতে প্রিয়কে খুঁজতে আমার সাথে বের হয় নাহিদ। পথে শুনতে পাই, হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুনে অনেক মানুষ মারা গেছে। স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধার তদারকিতে আছে। কোথাও ছেলেকে না পেয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে যাই। সেখানকার ওয়ার্ডগুলোতে না পেয়ে মর্গে গিয়ে প্রিয়র মরদেহ দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, ‘প্রিয়র লাশ দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যে ছেলেকে বিকেলে বাড়ি থেকে হাসিমুখে বের হতে দেখলাম, রাতে তার লাশ মর্গে পড়ে আছে! মনে হলো দুনিয়ায় নেই আমি। বুকটার মধ্যে হাহাকার করে উঠলো। হাসপাতালেই জানতে পারলাম, হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আটকেপড়াদের উদ্ধার করতে গিয়ে প্রিয়র মৃত্যু হয়। প্রিয়র শ্বাসকষ্ট ছিল। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা যায় সে।’
‘এখন আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। বুকটা পাথর হয়ে গেছে। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে এক সময় প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বাস্তবতা মেনে নিয়েছি। শুধুমাত্র ছেলের শহীদের মর্যাদাটুকু চাই,’ সুবর্ণভূমিকে বলছিলেন এই সন্তানহারা বাবা।
তার বক্তব্য, হোটেলে জাবিরের শহীদদের নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা রয়েছে। কিন্তু সবাই তো এক রকম না! ছাত্রদের অনেকেই গিয়েছিল উদ্ধার তৎপরতায়। কিন্তু তাদের শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। একটি কুচক্রী মহল এটাকে নানা রং মাখিয়েছে।
তিনি জানান, সে সময় যশোরের অনেক নেতা কথা বলেছেন তার সাথে। বর্তমান প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত খোঁজ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহার পৌঁছে দিয়েছেন।
‘আমি কিছুই চাই না, শুধু শহীদের মর্যাদাটুকু চাই,’ দাবি এই হতভাগ্য বাবার।
‘‘প্রিয় আমার বড় ছেলে। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। দারুণ ছটফটে ছিল। তেমন কোনো চাহিদা ছিল না। ছোট দুই ভাইকে দেখে রাখতো। ওর খালাতো ভাইকে বলতো, ‘আমার কিছু হয়ে গেলে ছোট ভাইদের দেখিস।’ আন্দোলনের অনেক ছবি রয়েছে প্রিয়র। মেধাবী ছাত্র হিসাবে অনেক পুরস্কারও পেয়েছিল সে। সেগুলো দেখলে বুকটা ফেটে যায়,’’ বলছিলেন প্রিয়র মা রেহেনা পারভীন কুইন।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এই দম্পতির ভাষ্য, যে কারণে প্রিয়র মতো হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জীবন দিলো, সেই পরিস্থিতি দেশে আর হোক তা তারা চান না। তারা শান্তি চান। সবাই মিলেমিশে বসবাস করতে চান। সরকার দেশের পরিস্থিতি শান্তিময় করতে না পারলে ছাত্র-জনতার জীবন দেওয়া বৃথা হয়ে যাবে বলে মনে করেন তারা।