সম্পাদকীয়
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত ‘ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা কাগজ-কলমেই’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে কী ভয়াবহ ফাঁক থেকে যাচ্ছে, তার স্বরূপ তুলে ধরেছে।
২০১৪ সালে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর নির্দেশনা জারি করেছিল। এক যুগ পর সেই নির্দেশনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে বলে প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়। যশোর জেলায় গত তিন মাসে ৫৩৮ জন গর্ভবতী নারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, অথচ অ্যাম্বুলেন্স রেজিস্টারে মাত্র একজন প্রসূতির নাম রয়েছে। এটি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার চূড়ান্ত নজির।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেশিরভাগ পরিবারই জানেন না যে, সরকারি এমন সুবিধা বিদ্যমান। হাসপাতালের সিটিজেন চার্টার থেকে শুরু করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স- কোথাও নেই কোনো সচেতনতামূলক নির্দেশনা। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দ্বারস্থ হচ্ছেন প্রায় সবাই। অথচ প্রতি মাসে এই খাতে শুধু প্রসূতিদের কাছ থেকে আদায় হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। বার্ষিক এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। এই অর্থ যদি নীতিমালা মেনে সাশ্রয় হতো, তাহলে তা প্রান্তিক মানুষের জন্য কত বড় স্বস্তি হতে পারতো তা সহজেই অনুমেয়।
আরও আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সগুলো ‘সাধারণ রোগী পরিবহনে’ ব্যবহৃত হয়; প্রসূতিদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই, প্রশাসনিক উদ্যোগও নেই। এমনকি নতুন অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো চাহিদাপত্রও পাঠানো হয়নি। অর্থাৎ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগ্রহী নন।
এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। রোগীদের কাছ থেকে কিলোমিটারপ্রতি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে, আবার এই অর্থ আদায়ের বিপরীতে রশিদও দেওয়া হয় না। ফলে এই অর্থের কোনো সরকারি হিসাব নেই। এটি স্পষ্ট দুর্নীতি, যা স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক নীতিকে চরমভাবে আঘাত করে।
এই ব্যর্থতার পরিণতি শুধু আর্থিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মা ও নবজাতকের জীবন। প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বক্তব্য স্পষ্ট- প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারলে জটিলতা দ্রুত বাড়ে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, উচ্চ রক্তচাপজনিত খিঁচুনি, প্রসব বিলম্ব- এসব পরিস্থিতিতে দেরিতে পৌঁছালে মৃত্যুঝুঁকি ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা শুধু মৃত্যু ও জীবন, সাশ্রয় ও ব্যয়ের প্রশ্ন নয়; এটি একজন প্রসূতির অধিকার। আর সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। হাসপাতালের সিটিজেন চার্টার ও নোটিস বোর্ডে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার ও ভাড়া আদায়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। রশিদ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসূতিদের জন্য আলাদা অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দের পাশাপাশি দ্রুত সেবা নিশ্চিতে একটি কার্যকর হটলাইন চালু করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত মনিটরিং সেল গঠন করতে পারে, যা মাঠপর্যায়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন তদারকি করবে।
২০১৪ সালের নির্দেশনা বাতিলের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তা বলবৎ আছে। আগের কর্মকর্তারা বাস্তবায়ন করেননি, তাই বলে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তরা করবেন না- এটি হতে পারে না।
যশোরের হালিমা বেগম, জেসমিন সুলতানা কিংবা সানজিদা সুলতানারা, যারা অজ্ঞাতে বা বাধ্য হয়ে ভাড়া দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে গেছেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে আর কোনো মা যেন এই প্রতারণার শিকার না হন। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাটা দায়িত্ব, অনুগ্রহ নয়। সরকারি নির্দেশনা কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না।