সম্পাদকীয়
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীবনরেখা যশোর-খুলনা মহাসড়কটি যেন এক চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর, প্রকল্পের পর প্রকল্প, কোটির পর কোটি টাকা ব্যয় করেও এই সড়কের সংস্কার কাজ শেষ হয়নি; বরং প্রতিবারই যেন পুরনো ক্ষতের ওপর নতুন ঘা তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ার পরও যখন সড়কটি কাদা, ধুলো ও যানজটের কারণে জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন এই বিপুল অর্থব্যয়ের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। কিন্তু যশোর-খুলনা মহাসড়কের চিত্রে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। একদিকে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, অপরদিকে মংলা সমুদ্রবন্দর, খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দর- এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ রক্ষাকারী এই পথটি যখন দীর্ঘ নয় বছর ধরে নির্মাণাধীন থাকে, তখন এর প্রভাব শুধু যানজটেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এমনকি ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামকেও প্রভাবিত করে।
সুবর্ণভূমির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই সড়কে চালকদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে টায়ার, চেসিস, স্টিয়ারিং হ্যাঙ্গার প্রতিস্থাপনে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে টায়ারের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। কর্দমাক্ত ও ব্যবহার-অনুপযোগী সড়কে চলাচলের কারণে টায়ারের মেয়াদ কমছে দ্রুত। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ঠিকাদারকে জরুরি কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে দেরি হচ্ছে। এ এক চিরায়ত অজুহাত! বছরভর কি কেবল বৃষ্টিই হয়? যথাযথ পরিকল্পনা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং মানসম্মত নির্মাণকাজ থাকলে বছরের পর বছর একই সড়কে বারবার সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে না।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া জোড়াতালি দিয়ে সংস্কারের কারণে এত অর্থ অপচয় হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর সংস্কারের নামে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে তা থেকে সুদ, কমিশন ও ঘুস বাবদ বিপুল অর্থ লোপাটের অভিযোগও পুরনো। যদি এই অর্থের সঠিক ব্যবহার করা হতো, তবে আজ যশোর-খুলনা মহাসড়ক একটি আন্তর্জাতিক মানের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারতো।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই সড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। খাদ্যশস্য, সার, কয়লা, শিল্পের কাঁচামাল- প্রতিদিন হাজার হাজার টন পণ্য চলাচল করে এই পথে। কিন্তু সড়কের অব্যবস্থাপনার কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, বাড়ছে উৎপাদন খরচ, শেষ পর্যন্ত তা বাড়তি মূল্য হিসেবে পড়ছে সাধারণ ক্রেতার কাঁধে। ব্যবসায়ীরা যেমনটি বলেছেন, ট্রাক পেতে দেরি হচ্ছে, পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। এর প্রভাব শেষাবধি দেশের সার্বিক বাণিজ্যে পড়ছে।
এই প্রকল্প সরকারি অর্থব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা এবং জনগণের করের টাকার সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আনে। যশোর-খুলনা মহাসড়কের এই করুণ অবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি আমূল পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি জোড়াতালি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও মানসম্মত পরিকল্পনা।
আমরা সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে এই সড়কের পুরো অংশের স্থায়ী ও মানসম্মত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। খরচের হিসাব জনগণের সামনে উপস্থাপন করে অতীতের বেহিসাবি অর্থব্যয়ের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একইসঙ্গে, বর্তমান প্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করতে নিয়মিত অগ্রগতি মনিটরিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। দুর্ভোগ থেকে মানুষকে নিষ্কৃতি দিন।