যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

মব জাস্টিস রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে না

শিলিগুড়িতে দুই মুসলিমকে নৃশংসভাবে হত্যা

প্রকাশ : সোমবার, ৫ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
মব জাস্টিস রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে না

ভারতের পশ্চিমবাংলার শিলিগুড়িতে গরু পাচারকারী সন্দেহে কয়েক মুসলমান ব্যক্তির ওপর হামলা এবং দুইজনকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারার ঘটনা আমাদের ভীষণভাবে শঙ্কিত করেছে। এই ঘটনাকে সাধারণ কোনো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার করবে রাষ্ট্রের আইন ও আদালত, উন্মত্ত জনতা নয়। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে পিটিয়ে হত্যা, গাড়িতে আগুন দেওয়া কিংবা প্রাণভয়ে পালাতে থাকা ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয়, কারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং পুলিশের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের পরিবার যেন ন্যায়বিচার ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের তদন্ত ও বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে; গুজব, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জনতার অনুমানের ভিত্তিতে নয়।

ভারতে গরু নিয়ে সন্দেহের জেরে মুসলিমদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন নয়। এ ধরনের ঘটনাগুলো বারবার একটি বিপজ্জনক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছে—গুজব যখন ধর্মাশ্রয়ী হয়ে ওঠে, তখন একজন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে জনতার ‘অপরাধী’ হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সন্দেহ অপরাধের প্রমাণ নয়, আর জনতার রায় আইনের বিকল্প নয়।

এখানে প্রশ্নটি কেবল সাম্প্রদায়িকতার নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও আইনের শাসনের প্রশ্নও। পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো উত্তেজিত পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা করা, অপরাধের তদন্ত করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। কোনো গোষ্ঠী যদি মনে করে যে তারা নিজেরাই বিচার, শাস্তি এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে।

নরেন্দ্র মোদির পরিচয় ছিল ‘গুজরাটের কসাই’ হিসেবে। কারণ তিনি ভারতের একটি রাজ্য—গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাবস্থায় সেখানে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, প্রকারান্তরে মুসলমানদের ওপর যে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, তা ছিল বর্তমান দুনিয়ার বিরল বর্বরতাগুলোর একটি। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এই বিজেপি ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতারোহণের পর ক্রমে দেশটিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ঢেকে দিয়েছেন। তার দল যে রাজ্যেই ক্ষমতায় যাচ্ছে, সেখানেই সংখ্যালঘুরা বিপন্ন অবস্থায় পড়ছে।

সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতারোহণের পর দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে এই দলের নেতাকর্মীরা। ধর্মীয় মেরুকরণকে ভোটের রাজনীতির হাতিয়ার বানানো, গুজবকে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে স্বাভাবিক করে তোলা—এসবের পরিণতি শেষ পর্যন্ত রাস্তায় সহিংসতা হিসেবেই ফিরে আসে।

ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও আইনের সমান সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। সেই অধিকার হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে সবার। সেদেশে গরু জবাই করা, গরুর মাংস বহন ও খাওয়া রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ নয়। তাহলে মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মের মানুষ গরুর মাংস খেলে তা কেন আইনের ব্যত্যয় হবে? তাছাড়া কোনো ব্যক্তি গরু পাচারের সঙ্গে জড়িত কি না, তিনি কোনো অপরাধ করেছেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার। ধর্মীয় পরিচয় কখনোই অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।

গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তাই কোনো একটি সম্প্রদায়ের পক্ষ নেওয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রই যখন কোনো সম্প্রদায়ের জন্য নিপীড়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন সেখানে বসবাস করা কঠিনই হয়ে পড়ে। ইতিপূর্বে গুজবের ভিত্তিতে ভারতজুড়ে বহু মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো অপরাধী সাজা পেয়েছে—এমন নজির নেই। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ তো পক্ষপাতদুষ্টই, তার প্রভাব পড়েছে খোদ দেশটির বিচার বিভাগের ওপরও।

আমরা শিলিগুলিসহ এযাবৎ ভারতে সংঘটিত প্রত্যেকটি গণপিটুনির ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাই। রাষ্ট্রের শক্তি জনতার উন্মত্ততায় নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আদালতের; জনতার নয়। আর একজন নাগরিকের নিরাপত্তা তার ধর্ম, জাতি কিংবা পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই আধুনিক দুনিয়ায় চলে না। ‘মব জাস্টিস’ কখনো কোনো রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)