যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মাঠ আছে খেলোয়াড় আছে, তবু কেন থমকে যশোরের ক্রীড়াঙ্গন

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : সোমবার, ৫ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
মাঠ আছে খেলোয়াড় আছে, তবু কেন থমকে যশোরের ক্রীড়াঙ্গন

খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়; একটি সুস্থ সমাজ গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। যে মাঠে তরুণের পা পড়ে, সেই মাঠ থেকে তাকে মাদকের আসরে টেনে নেওয়া কঠিন। যে যুবক একটি দলের জার্সি গায়ে তুলে নেয়, তার হাতে মাদকের প্যাকেট তুলে দেওয়ার সুযোগও কমে আসে। শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও পরাজয় মেনে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয় খেলাধুলা।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে সময়ে তরুণ সমাজকে মাঠমুখী করার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেই সময়ে যশোরের ক্রীড়াঙ্গন কেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে?
যশোরের ক্রীড়া ইতিহাস সমৃদ্ধ। এই জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে বহু খেলোয়াড় উঠে এসেছেন। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকসসহ বিভিন্ন খেলায় যশোরের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। একসময় মাঠে মাঠে প্রতিযোগিতা ছিল, ক্লাবগুলো ছিল সক্রিয়, খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতার তীব্রতা। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে ঘিরে।

২০২২ সালের পর থেকে নির্বাচিত কমিটি নেই। এমন অবস্থার অবসান কবে হবে?

একটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচিত কমিটি বছরের পর বছর না থাকা কোনো স্বাভাবিক সাংগঠনিক বাস্তবতা হতে পারে না। নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; নির্বাচন মানে জবাবদিহি, অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বের বৈধতা। ক্রীড়া সংগঠকদের ভোটে নির্বাচিত একটি কমিটির কাছে প্রশ্ন করা যায়, প্রত্যাশা করা যায়, ব্যর্থতার হিসাব চাওয়া যায়।

কিন্তু যখন নির্বাচিত কমিটিই থাকে না, তখন সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

জাতীয় প্রতিযোগিতা আয়োজনই কি শেষ কথা

যশোরে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ফেডারেশন বা সংস্থার প্রতিযোগিতার স্থানীয় পর্ব আয়োজন হয়—এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু একটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্ব কি কেবল অন্যের নির্ধারিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করেই শেষ?

যদি জেলার নিজস্ব ক্রীড়াপঞ্জি না থাকে, নিয়মিত লিগ না থাকে, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা না থাকে, নতুন খেলোয়াড় তৈরির পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ক্রীড়া উন্নয়ন কীভাবে হবে?

একজন তরুণ খেলোয়াড় সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনুশীলন করবে, কিন্তু প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ পাবে না—এভাবে কি প্রতিভা বিকশিত হয়?
মাঠে নিয়মিত খেলা না থাকলে সেই মাঠের জায়গা অন্যদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

খেলার মাঠ যখন খেলোয়াড়ের পদভারে প্রকম্পিত হয় না, তখন সেখানে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড ঢুকে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। আর সেই কারণেই খেলাধুলাকে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার বলা হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে শুধু স্লোগান নয়, মাঠও চাই

মাদকবিরোধী সভা হবে, মানববন্ধন হবে, পোস্টার হবে—সবই দরকার। কিন্তু একটি কিশোর বা যুবককে মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রতিদিনের বিকল্প কর্মকাণ্ড তৈরি করা আরও জরুরি।

সেই বিকল্পের সবচেয়ে কার্যকর জায়গাগুলোর একটি হলো খেলার মাঠ।

একটি ফুটবল লিগ মানে শুধু ২২ জন খেলোয়াড় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কোচ, রেফারি, সংগঠক, কর্মকর্তা, দর্শক ও সমর্থক। অর্থাৎ একটি ক্রীড়া আয়োজন একসঙ্গে অনেক তরুণকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

তাই ক্রীড়া আয়োজন বন্ধ থাকা বা কমে যাওয়া নিছক ক্রীড়া সমস্যা নয়। এর সামাজিক প্রভাবও রয়েছে।

যে জেলা মাদকমুক্ত যুবসমাজ চায়, সেই জেলায় মাঠকে সচল রাখতে হবে। যে সমাজ তরুণদের নৈতিকতার পথে দেখতে চায়, তাকে তরুণদের জন্য নিয়মিত ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তৈরি করতে হবে।

প্রতিভা কি শুধু জাতীয় দলের চিঠিতে তৈরি হবে

আরেকটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না—জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি হয় স্থানীয় মাঠ থেকেই।

আজ যে কিশোরটি পাড়ার মাঠে খেলছে, আগামীকাল সে হয়তো জেলার দলে খেলবে। তার পর জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাই যদি নিয়মিত না থাকে, তাহলে সেই প্রতিভা বিকশিত হবে কীভাবে?

একজন খেলোয়াড়কে শুধু অনুশীলনের মধ্যে রেখে জাতীয় মানের খেলোয়াড় বানানো যায় না। প্রয়োজন প্রতিযোগিতা, চাপ, অভিজ্ঞতা এবং নিয়মিত ম্যাচ।
যশোরে সেই সুযোগ যত কমবে, প্রতিভা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তত বাড়বে।

নির্বাচন নিয়ে নতুন আশার আলো

ক্রীড়াঙ্গনে এখন আলোচনা রয়েছে, চলতি অক্টোবরেই যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে এবং নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবু এই আলোচনা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

যদি নির্বাচন হয়, তাহলে সেটি যেন শুধু কমিটি পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়। প্রশ্ন হলো—নতুন নেতৃত্ব যশোরের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কী পরিকল্পনা নিয়ে আসবে?
শুধু পদ-পদবি ভাগাভাগি করলে হবে না। দরকার মাঠের জন্য পরিকল্পনা, খেলোয়াড়ের জন্য পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পনা।

ক্রীড়া সংস্থা কি ক্লাবগুলোর সঙ্গে কথা বলে

যশোরের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, ক্লাব ও সাবেক খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় ছাড়া জেলার ক্রীড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।

কোন খেলায় কী সমস্যা, কোন মাঠে কী সংকট, কোন বয়সভিত্তিক খেলোয়াড়রা সুযোগ পাচ্ছে না, কোন ডিসিপ্লিনে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, কোন ক্লাব কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে?—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মাঠে যেতে হবে, সংগঠকদের সঙ্গে বসতে হবে, খেলোয়াড়দের কথা শুনতে হবে।

ক্রীড়া সংস্থা যদি মাঠের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে, তাহলে কাগজে-কলমে ক্রীড়া প্রশাসন থাকলেও মাঠে ক্রীড়া আন্দোলন তৈরি হয় না।

এবার দরকার ‘বার্ষিক ক্রীড়াপঞ্জি’

নতুন কমিটির সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত বার্ষিক ক্রীড়াপঞ্জি তৈরি করা।

বছরের শুরুতেই নির্ধারিত থাকবে—কখন ফুটবল, কখন ক্রিকেট, কখন অ্যাথলেটিকস, কখন বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, কখন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। জেলা পর্যায়ের ক্লাব ও সংগঠনগুলোকে এই ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

প্রতিযোগিতা নিয়মিত হলে খেলোয়াড় তৈরি হবে। খেলোয়াড় তৈরি হলে ক্লাব সক্রিয় হবে। ক্লাব সক্রিয় হলে মাঠ সরব হবে। আর মাঠ সরব হলে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ বাড়বে।

এই সহজ সূত্রটি বোঝার জন্য বড় কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই।

দায় নেবে কে

যশোরের ক্রীড়াঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতির দায় এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। জেলা প্রশাসন, ক্রীড়া সংস্থা, ক্রীড়া সংগঠন, ক্লাব, ফেডারেশন এবং স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী সমাজ—সবারই ভূমিকা রয়েছে।

তবে নেতৃত্বে যারা থাকবেন, তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশা থাকবেই।

বছরের পর বছর নির্বাচিত কমিটি না থাকার পর যদি নির্বাচন সত্যিই সামনে আসে, তাহলে সেটি যেন নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু হয়।

সেই অধ্যায় হবে এমন—যেখানে পদ পাওয়ার চেয়ে কাজ করার প্রতিযোগিতা বেশি হবে; যেখানে ছবি তোলার চেয়ে মাঠে খেলা বেশি হবে; যেখানে অনুষ্ঠান করার চেয়ে খেলোয়াড় তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

কারণ যশোরের ক্রীড়াঙ্গন কোনো ব্যক্তির পদ-পদবির জায়গা নয়। এটি একটি জেলার তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মাঠকে বাঁচাতে হলে মাঠে খেলা ফেরাতে হবে। খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হলে তাদের মাঠে রাখতে হবে। আর ক্রীড়াঙ্গনকে সচল করতে হলে প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক, কার্যকর ও নির্বাচিত নেতৃত্ব।

যশোর অনেক কিছুতে ঐতিহ্যের দাবিদার। ক্রীড়াঙ্গনের ঐতিহ্যটুকুও যেন শুধু পুরনো গল্প হয়ে না থাকে—এ দায়িত্ব এখন সবার। নির্বাচনের অপেক্ষা শেষ হোক। অচলাবস্থার অবসান হোক। আবার সরব হোক যশোরের মাঠ।

লেখক: ক্রীড়ালেখক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)