পার্থিব আহসান
আজকের শিশুই আগামীর দিশারি। তাদের যথার্থ বিকাশের পথ সুগম করা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতির প্রধান লক্ষ্য। কোন পথে শিশু বড় হয়ে উঠবে তার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অভিভাবকরা গ্রহণ করলেও সময়ের পরিক্রমা ও আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা চিরন্তন। সকল প্রাণীই তার সন্তানের প্রতি সচেতন। এটি জিনের সাথে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রবহমান। তবে প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীরা নির্ধারিত স্বভাবজাত নিয়মে বড় হয়। তবে মানুষ চিন্তা, বুদ্ধিমত্তা ও বিবেক-বিবেচনায় সম্পূর্ণ স্বাধীন। এই বৈচিত্র্যের মাঝেও সব মানুষের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু একটিই—সন্তানের সুন্দর, নিরাপদ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান যেমনই হোক না কেন, সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন একই সূত্রে গাঁথা। সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া, মানসিকভাবেভাবে গড়ে তোলা, মানবিক মূল্যবোধ শেখানো এবং পরিবর্তিত সমাজ ও পরিবেশের উপযোগী করা অভিভাবকের দায়িত্ব। সন্তান যাতে জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলতে পারে।
সন্তানের প্রতি স্নেহ ও যত্ন প্রাণীর সহজাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্য। তবে অন্যান্য প্রাণী কেবল প্রাকৃতিক স্বভাব অনুসরণ করে বড় হয়। মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। কারণ মানুষ নিজস্ব বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় অনন্য। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাত্রার মানুষেরও শেষ চাওয়া হলো সন্তানের মঙ্গলজনক ভবিষ্যৎ।
সামর্থ্যের দিক থেকে পরিবারে ভেদাভেদ থাকতে পারে। কিন্তু সন্তানের ভালোবাসা ও সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে সব মা-বাবার মন এক।
আমরা আজকের তরুণ সমাজের বেপরোয়া আচরণ দেখে প্রায়ই চিন্তিত আর অবাক হই। তবে এর দায় শুধু তাদের নয়। আমরাই নিজেদের স্বার্থে অনেক সময় তাদের ভুল পথে ঠেলে দিই। তাছাড়া, অনেক অভিভাবকই সে খবর রাখেন না যে, তাদের সন্তান বাইরে কার সাথে মিশছে বা কেমন পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে।
মা-বাবা অনেক সময় অতিরিক্ত স্নেহের কারণে সন্তানকে সঠিক বয়সে প্রয়োজনীয় শাসন ও নৈতিকতা শেখাতে ভুল করেন। এর কুফল সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় যখন সন্তান স্বাবলম্বী হওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। কিন্তু ততদিনে মা-বাবা ভুল বুঝতে পারলেও সন্তানের স্বভাব ও ভবিষ্যতের যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে যায়।
শিশুরা জন্মগতভাবেই অনুকরণপ্রিয়। তারা আশপাশের পরিবেশ দেখে এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার নিয়ম শেখে। তাই শৈশব থেকেই যদি তাদের কোনটি করণীয় ও কোনটি বর্জনীয়, বাস্তবতার শিক্ষা, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা এবং পরিশ্রমের গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করানো যায়, তবেই আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা তাদের জন্য সহজ ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে।
একটি শিশু বাইরের মানুষের সাথে কীভাবে মিশবে, স্কুলে সহপাঠীদের সাথে কেমন সম্পর্ক গড়ে তুলবে কিংবা শিক্ষকদের কীভাবে সম্মান জানাবে তার প্রথম পাঠ পরিবার থেকেই শিখে আসতে হয়। খুব কম বয়সে তাদের সাথে প্রতিদিনের সাধারণ ও স্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমেই এই মৌলিক মূল্যবোধগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিখিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এর পাশাপাশি ছেলেমেয়ে-নির্বিশেষে সবার সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, সবাইকে সমান মর্যাদার চোখে দেখতে শেখা এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলোকে স্বাভবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবকদের মূল দায়িত্ব হলো সন্তানকে এমন সুশিক্ষা দেওয়া, যাতে সে যেকোনো পরিবেশে তার সুন্দর ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সবার মাঝে নিজস্ব স্থান তৈরি করে নিতে পারে।
আজকাল ছোট পরিবারে সদস্য কম হওয়ায় শিশুরা শুরু থেকেই অতিরিক্ত মনোযোগ ও প্রশ্রয় পেয়ে বেড়ে ওঠে। সন্তানকে সন্তুষ্ট রাখতে মা-বাবা প্রায়ই সাধ্যের বাইরে গিয়ে তার আবদার মেটানোর চেষ্টা করেন।
পছন্দের খাবার থেকে শুরু করে শিশুর যেকোনো চাওয়া সাধ্যের বাইরে হলেও পূরণ করে দেওয়ার এই প্রবণতা তার মধ্যে অহংবোধ ও স্বার্থপরতা তৈরি করে। ফলে ভবিষ্যতে বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতির সাথে সে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয় এবং সহজেই হতাশ, ক্ষুব্ধ ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
জীবন নিরন্তর লড়াইয়ের ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই সংগ্রামের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে হয়। সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানোর পথ কখনোই সহজ না। তাই শৈশব থেকেই সন্তানকে পরিশ্রমের গুরুত্ব বোঝানো উচিত। কারণ, কষ্ট ছাড়া বা হুট করে পাওয়া সাফল্য কখনোই দীর্ঘদিন টিকে থাকে না।
প্রয়োজনে যেকোনো কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং কোনো কাজকেই ছোট না ভাবার বোধ শিশুর মনে গেঁথে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব হলো শিশুদের জন্য এমন একটি পরিমণ্ডল তৈরি করা। তাহলে তারা বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে এই বাস্তব সত্যানুভূতিগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।
আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এর সুদূরপ্রসারী সুফল অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা কখনোই কেবল অন্ধ মুখস্থবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করে হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল বা উচ্চ পদে পৌঁছানো সম্ভব, কিন্তু একজন পূর্ণাঙ্গ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হওয়া কঠিন।
পরীক্ষায় প্রথম হওয়া, জিপিএ-৫ পাওয়া কিংবা ভবিষ্যতে ডাক্তার, প্রকৌশলী বা ব্যারিস্টার হওয়ার চেয়েও বড় কথা হলো সন্তান ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কি না। বিষয়টি খেয়াল রাখা মা-বাবার প্রথম দায়িত্ব। সন্তান কোন বিষয়ে আগ্রহী এবং তার মনের চিন্তা কী, মা-বাবা যদি তা বুঝতে পারেন, তবে তাকে সুশিক্ষিত, সৎ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব।
একটি শিশুর জীবনের পথচলাতেও তার মেধা ও আগ্রহকে প্রাধান্য দিতে হবে। সব ক্ষেত্রে সন্তানকে প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে না ঠেলে, নিজের পছন্দের জায়গা ও মেধা অনুধাবনের সুযোগ দিলে সে আনন্দের সাথে শিখবে এবং তার সৃজনশীলতা বিকশিত হবে। মনের এই ভেতরের তৃপ্তি তাকে নম্র ও বিনয়ী করে তুলবে।
শিশুকে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য ছোটবেলা থেকে সহনশীলতা ও ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সুস্থ দিকনির্দেশনা দেওয়া। মা-বাবা হওয়া সহজ, কিন্তু একজন সচেতন অভিভাবক হওয়া বেশ কঠিন। আগামী দিনে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল দেশ গঠন করতে হলে আজকের শিশুর সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতেই হবে।
লেখক: যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী