সমাজচিন্তা
মেহ্দিউর রহমান টুটুল
পরিবার ভাঙছে, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের, পিতার সঙ্গে পুত্রের, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর দূরত্ব বাড়ছে। আজকাল সাধারণ মানুষও নির্ভেজাল আড্ডা দিতে ভুলে যাচ্ছে। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে পরস্পরের সাহচর্য যে কখনও কাম্য হতে পারে- এই ধারণাটাই মানুষের আস্তে-ধীরে কমে আসছে। এখন পাঁচ-ছয়জন মানুষ এক জায়গায় হলেও প্রায়ই পরস্পরের দিকে না তাকিয়ে, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক-মেসেঞ্জারে মগ্ন হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে ভাঙছে সমাজের বাঁধন। মায়া-মমতা-সংযম-নীতিবোধ, যেসব জিনিস মানুষে-মানুষে সম্পর্ককে মধুর করে রাখতো, সেসব আস্তে আস্তে জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে। বিশেষ করে নীতিবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ফলে অপরাধ ও ব্যাভিচার দুটোই বাড়ছে। নীতির বাঁধন না থাকায় মানুষ রিপুতাড়িত হয়ে যতোক্ষণ বাধা না পায়, ততোক্ষণ যা পারে তাই করে চলেছে। মেয়েরা এমন পোশাক পরে যে মুখ তুলে তাকানো যায় না। টেলিভিশনে এমন জিনিস দেখায় যে পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে দেখতে পারে না। সঙ্গীত, যার সম্বন্ধে আগে বলা হতো ‘মিউজিক ইজ ডিভাইন’, আজকাল ‘ভিজ্যুয়াল’ নামক আইটেমের কল্যাণে এক অদ্ভুত বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ‘ভিজ্যুয়াল’ মানে বিশেষ ধরনের নাচ, যাকে বলা যেতে পারে ভার্টিক্যাল এক্সপ্রেশন অব এ হরাইজেন্টাল ডিজায়ার, শুয়ে শুয়ে যা করার ইচ্ছা, খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে বা নেচে তার ইঙ্গিত করা।
জেলা ও নিম্ন আদালতগুলো ভরে গেছে শুধু বিচ্ছেদ আর উচ্ছেদের মামলায়। প্রায়ই শোনা যায় ছোট শিশুকে নিয়ে পিতা-মাতার টানাটানির হৃদয়বিদারক কাহিনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সব রসাতলে গেছে। এরকম আমরা দু’বেলা শুনতে পাই মধ্যবয়সী-প্রৌঢ় ও বৃদ্ধদের কথাবার্তায়। অথচ স্থির হয়ে যদি ভাবি, এসব কথা কি আমরা চিরকালই শুনে আসছি না? আগে সব ভালো ছিল। পৃথিবী সুন্দর ছিল! ছেলেমেয়েরা পিতা-মাতার বাধ্য ছিল। কত ভদ্রভাবে কথা বলতো, এসব কি আবহমানকাল ধরে প্রৌঢ়-বৃদ্ধরা বলে আসেননি! চিরকালই বর্তমানকে দোষ দেওয়া এবং অতীতকে নিয়ে আফসোস করা একটা চালু প্রক্রিয়া। আর এই ধারার মূল সুর হচ্ছে: সমাজ গেলো, নীতি গেলো, বংশ গেলো, ধর্ম গেলো। এই যে আবহমানকালের আফসোস, তার সঙ্গে কি বর্তমানের কিছু তফাৎ আছে? বাংলাদেশের পটভূমিকায় দেখলে মৌলিক তফাত তেমন চোখে পড়ে না। তবে গত দু’তিন দশকে কিছু কিছু ঘটনার কারণে সমাজের এই পরিবর্তন দ্রুততর হয়েছে, পাশাপাশি নীতিবোধেরও পরিবর্তন সাধন করেছে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়েই সামান্য কিছু আলোচনা—গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন। এটা ঘটেছে গত তিন দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থার অসাধারণ উন্নতির ফলে। আশির দশকের গোড়ায় যেখানে টেলিভিশন ছিল নেহাত স্থানীয় ব্যাপার, টেলিফোন ও টেলেক্সই দূরের যোগাযোগের প্রধান ব্যবস্থা ছিল, সেখানে আজকে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের কল্যাণে সারা পৃথিবীর টেলিভিশন ঘরে বসে দেখা যাচ্ছে, টেলিফোন হাতের নাগালে। টেলেক্স, টেলিগ্রাফ বিলুপ্তির পথে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের নাম সাধারণ মানুষও জানে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত বিশ্বের উপর ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্য বাড়াবাড়ি। যার নেতৃত্ব দিচ্ছে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকানদের এই সাংস্কৃতিক মুরব্বিগিরি অনেকেরই পছন্দ নয়, এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোর তো নয়ই, এ সংস্কৃতির উৎস যে পশ্চিম ইউরোপ, প্রধানত ব্রিটেন, তাদেরও পছন্দ নয়। এমনকি সর্বক্ষেত্রে আমেরিকানদের ছায়াসঙ্গী কানাডিয়ানদের পর্যন্ত পছন্দ নয়। কিন্তু উপায় নেই, সহ্য করতে হচ্ছে। কারণ মার্কিন ডলারের অসাধারণ ক্ষমতা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপুল অগ্রগতির ফলে এই সংস্কৃতি ভূমণ্ডলের সকল প্রান্তে পৌঁছে গেছে।
নানারকমভাবে এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজজীবনকেও প্রভাবিত করেছে, প্রধানত শহরাঞ্চলে। গ্রামাঞ্চলে কিছুটা কম কিন্তু একেবারে অনুপস্থিত নয়। আমেরিকান সংস্কৃতির মূল নিহিত আছে অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতিতে, যা প্রধানত উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের বিশেষত প্রটেস্ট্যান্ট ব্রিটেনের সংস্কৃতি। অর্থ-সম্পদে বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও এই সংস্কৃতির প্রতিভূ বহুকাল পর্যন্ত ব্রিটিশরাই ছিল, আমেরিকানরা নয়। কিন্তু দিন পাল্টেছে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফিলিয়াল লাভ, অপত্যস্নেহ, অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতিতে খুব উচ্চস্থান অধিকার করে না। সন্তান ও মাতা-পিতার মধ্যে যে স্নেহ-ভালোবাসা তার চাইতে স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে ভালোবাসার স্থান অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কৃতিতে অনেক উঁচুতে। এই ভালোবাসার মধ্যেও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্থান অত্যন্ত প্রবল, পরস্পরের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার রীতি এই সংস্কৃতিতে বিশেষ নেই। মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সংস্কৃতি পুরোপুরি অ্যাংলো-স্যাক্সন নয়, ইটালিয়ান-ইহুদি প্রভৃতি জাতির মধ্যে অপত্যস্নেহের জোর অনেক বেশি, তবে অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রাধান্যই প্রবল। ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিতের ধারণা থেকে না দেখেও বলা যায় এই সংস্কৃতির প্রভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যে বাড়বে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
এছাড়া আছে প্রচার মাধ্যমের প্রভাব তথা মিডিয়া হাইপ। বাইপোলার বিশ্বপরবর্তী জমানায় বিশ্বায়নতন্ত্রের শুরুর সময় থেকেই প্রচার মাধ্যম তথা মিডিয়া এবং বিজ্ঞাপিত চিন্তার প্রভাব মানুষ নতুনভাবে অনুভব করলো। বিশেষত ইরাক যুদ্ধ সময়কালীন ‘এমবেডেড জার্নালিজম’ এবং গোয়েবলসীয় তত্ত্ব- ‘বারবার মিথ্যা বললে সেটা এক সময় সত্যে পর্যবসিত হয়’ ধারণাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলো। ফলত মানুষ সত্য ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন হলো, সমাজবাদের প্রবল শক্তি ন্যায় ধারণা থেকে এক কথায় তাকে বিচ্ছিন্ন করলো।
বিচ্ছিন্নতার আরেকটি কারণ ভোগবাদ। এটা পুরোপুরি পশ্চিমা নয়, উপমহাদেশের চার্বাক দর্শনে ‘ঋণ করে ঘি খাওয়ার’ মধ্যেও এর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বর্তমান সংস্করণটা প্রায় আশি শতাংশ পশ্চিমা। এই পশ্চিমা ভাবধারা আমাদের এখানে অন্য সমস্যা তৈরি করেছে। পাশ্চাত্যবাসী যখন ভোগ করে তখন তার মধ্যে লুকোছাপার প্রয়োজন মনে করে না, কারণ নিজের উপার্জিত পয়সায় নিজে খাচ্ছি তাতে কার কী বলার আছে? আমাদের চিন্তায় যেহেতু আত্মত্যাগ ব্যাপারটার মহত্ত্ব খুব গভীরভাবে প্রোথিত, সেই জন্য আমরা কখনও মন-প্রাণ খুলে ভোগ করতে পারি না, নানারকম প্রলেপ দিয়ে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে থাকি। এটা নিঃসন্দেহে ভণ্ডামি এবং কে না জানে আমাদের চরিত্রের বহুদোষের বীজ এই।
এগুলো গ্রহণযোগ্য করার নানা উপায় আছে। যিনি গুঁড়া মশলায় ধুলো অথবা সয়াবিনে পাম তেল ভেজাল দিয়ে পয়সা করেন, যিনি ভুয়া অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান খুলে গরিব মানুষের টাকা মেরে দেন, যিনি ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ প্রভৃতি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খুলে প্রতারণা করেন, যিনি দু’হাতে ঘুস খান, যিনি সাড়ে বারোটায় অফিসে এসে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে সাড়ে তিনটায় বাড়ি চলে যান- এরা সবাই এক পন্থায় চলেন না। কেউ ধর্মে আশ্রয় নেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন অথবা পূজাপাঠ করেন, মনে করেন ভোগ যেমন করছি ধর্মকর্মও তো তেমনই করছি। কেউ বিপ্লবে আশ্রয় নেন, কাজে ফাঁকি দেওয়াটাকে মনে করেন শাসক শ্রেণিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া। কেউবা মনে করেন সবই মায়া, আমি যা ভোগ করছি তাও তো মায়া! অর্থ উপার্জনের যেসব উপায়ের কথা বলা হলো তার প্রত্যেকটিই নীতিবিরুদ্ধ, উল্টোদিকে যারা সৎভাবে প্রচুর উপার্জন করেন তাদের এই প্রলেপ দেওয়ার প্রবণতা কম। এভাবে প্রলেপ দেওয়ার মাধ্যমে অন্যায় কাজকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থেকে জন্ম নেয় ভণ্ডামি।
এ প্রসঙ্গ একটু পরে, আপাতত ভোগবাদ সম্পর্কে এটুকুই উল্লেখ্য যে, আগের তুলনায় ভোগবাদের ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে। অতীতে ভোগ ব্যাপারটা জমিদার শ্রেণি জাতীয় ‘আইডল রিচ ক্লাস’-এর মধ্যেই অনেকটা সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষ ভোগের কথা ভাবতেই পারতো না। এমনকি ধনী ব্যবসায়ী ও উচ্চ চাকরীজীবী শ্রেণি পর্যন্ত অর্থ-উপার্জন বা পদোন্নতিকেই লক্ষ্যে পৌঁছবার পথ নয়, লক্ষ্য বলেই মনে করতো। এই ধারণা সারাদেশের জন্যই সত্য ছিল। সেদিন আর নেই। আজ কমবেশি সকলের জীবন ভোগবাদ আশ্রিত, যার থেকে জন্ম নেয় স্বার্থপরতা, বিচ্ছিন্নতা, নীতিহীনতা। অর্থাৎ সামাজিক বা নৈতিক অবনতির নালিশের মৌলিক না হলেও কিছু প্রভেদ আছে। এই প্রভেদ প্রধানত উপরিউক্ত কারণজনিত।
সমাজ থেকে এবার নীতির প্রশ্নে আসা যাক, কারণ নালিশ অসামাজিকতা ও নীতিহীনতা বিষয়ে। এখন প্রশ্ন, নীতি কে তৈরি করে? নীতির প্রয়োজন কী? নীতি না মানলে কী হয়?
নীতি তৈরি করে সমাজ। সমাজ মানে সেই মানুষের গোষ্ঠী, যারা কোনো এক বা একাধিক বন্ধনে বাঁধা। এই বন্ধন ভৌগলিক তো বটেই, তাছাড়াও ভাষার, ধর্মের-বংশের, আর্থিক অবস্থার। কখনও কখনও অন্যান্য উপাদানও কাজ করে। উল্লেখ্য, রাজনীতির বন্ধনে সাধারণত সমাজ তৈরি হয় না।
দেশকালভেদে সমাজ আপেক্ষিক, তাই নীতিও আপেক্ষিক। নীতির প্রধান প্রয়োজন ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারের মধ্যে সীমারেখা বেঁধে দেওয়াতে। একজনের স্বাধীনতা যাতে অন্যের অধিকারকে আহত না করে তা দেখার মধ্যে। অন্যভাবে বললে, কোথায় ব্যক্তির প্রয়োজনকে সমষ্টির প্রয়োজনের কাছে মাথা নিচু করতে হবে সেটা পরিষ্কার করে দেওয়ার মধ্যে। কিছু কিছু সামাজিক নীতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়, তখন তার নাম হয় আইন। আইন ভাঙলে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবলে, সমষ্টির প্রয়োজনে সেই আইন জোর করে প্রয়োগ করা হয়। আইন মূলত দু’রকম—দেওয়ানি ও ফৌজদারি। দেওয়ানি আইনভঙ্গ ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীকে পীড়িত করে, গোটা সমাজকে পীড়িত করে না। তাই এই আইন প্রয়োগ করার দায়িত্ব শুধু অংশত রাষ্ট্রের, বাকিটা পীড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তি গোষ্ঠীর। ফৌজদারি আইনভঙ্গ পুরো সমাজব্যবস্থাকে আঘাত করে, তাই এই আইন প্রয়োগের দাবি প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রের। ফৌজদারি আইন ভাঙলে শাস্তি হয়, ন্যূনপক্ষে জরিমানা, মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। দেওয়ানি আইন ভাঙলে শাস্তি হয় না কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। আর যেসব সামাজিক নীতি আইনের মর্যাদা পায়নি তা ভাঙলে বলা মুশকিল, অবস্থাবিশেষে কিছুই হয় না, আবার সেরকম অবস্থা হলে মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও খারাপ শাস্তি হতে পারে। এই শাস্তি সামাজিক বয়কট, অনেক সময় গণহত্যা, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক নীতি ভঙ্গকারীর নিরপরাধ আত্মীয় পরিজনও বাদ যায় না।
আমাদের মতো যেসব দেশের আইন ‘ইংলিশ কমন ল’ বংশজ সেইসব দেশে, যতক্ষণ না দোষ প্রমাণ হচ্ছে ততক্ষণ সন্দেহভাজন ব্যক্তি অর্থাৎ আসামি নির্দোষ। আর এই প্রমাণ দিতে হয় এমন এক বিচারব্যবস্থার সামনে যেখানে আসামি এবং রাষ্ট্রকে এক আসনে বসতে হয়। এসব আইনি ফাঁক দিয়ে প্রকৃত দোষী প্রায়শই গলে বেরিয়ে যায়। এটাও আইনসম্মত, কারণ আইন প্রয়োগের নীতি বলছে, শত সহস্র অপরাধী মুক্তি পাক, কিন্তু একজন নিরাপরাধও যেন সাজা না পায়। কিন্তু সামাজিক নীতি ভঙ্গকারীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মোটামুটি একটা বড় সংখ্যার মানুষ যদি ঠিক করে ফেলে যে অমুক দোষী, আর তার শাস্তি বয়কট অথবা উচ্ছেদ, তাহলে তাই হবে। জনতা চেয়েছে—এর উপরে তো কথা চলতে পারে না। ইংরেজিতে এর নাম ক্যাঙ্গারু কোর্ট। বাংলায় একে অনেক সময় গণআদালত বলা হয়।
সমাজকে বাদ দিয়ে যেমন ব্যক্তি চলতে পারে না, তেমনই ব্যক্তিকে বাদ দিয়েও সমাজ হতে পারে না। ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সেজন্যই প্রয়োজন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য। এই ভারসাম্য তৈরির ভার যুগে-যুগে দার্শনিক ও জননেতাদের ওপর পড়েছে। তাদের মধ্যে কেউ ব্যক্তির দিকে ঝুঁকেছেন, কেউ সমষ্টির দিকে। এরই ভিত্তিতে, সমাজ ও ব্যক্তির ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তে দুটি প্রধান মতবাদ জন্ম নিয়েছে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা ব্যক্তিবাদ এবং সমাজ কর্তৃত্ববাদ বা সমাজবাদ। এই মতবাদগুলির উপর চিন্তা বা প্রস্তাবনা দার্শনিক মতবাদ হয়ে থাকেনি, রাজনৈতিক মতাদর্শেরও রূপ নিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই দুটি মতবাদের মধ্যে মেরুকরণ ব্যাপারটা মূলত পাশ্চাত্য চিন্তার প্রভাবে। পাশ্চাত্য ব্যক্তিবাদ ও সমাজবাদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিবাদ ও সমাজবাদের মৌলিক তফাৎ আছে। পাশ্চাত্যে ব্যক্তিবাদের প্রভাবে যে ভোগবাদ সমাজগ্রাহ্য, আমাদের এখানে তা নিন্দনীয়—একথা পূর্বেই এ নিবন্ধে উল্লিখিত হয়েছে। অপরদিকে পশ্চিমী সমাজবাদের অন্যতম মূলকথা ‘তোমার যতোটুকু প্রয়োজন সমাজ থেকে সেটা নাও, যতোটুকু ক্ষমতা সমাজকে তাই দাও’—এর সঙ্গে আমাদের এখানকার ইসলামি সমাজবাদের সম্পর্ক খুবই অল্প।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে দেখতে গেলে, ব্যক্তিবাদ বা সমাজবাদ সেটা ধর্মহীন পশ্চিমী ধরনের হোক বা ধর্মাশ্রয়ী আমাদের মতো হোক, এর মধ্যে কোনটি সমাজকে সংঘবদ্ধ করে আর কোনটি বিচ্ছিন্নতাকে উসকে দেয় সে বিষয়ে প্রচুর চিন্তার অবকাশ আছে। ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার শুরু আমরা জানি উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে নিহিত, উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেই একদল মানুষ উৎপাদিত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, জীবন প্রক্রিয়ার সকল স্তরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্যবস্থার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়ে বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়।
নীতি প্রসঙ্গে বলতে গেলে, যদিও সমাজই নীতি তৈরি করে, তবুও এমন না যে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ালে নীতির বন্ধন অটুট থাকবে। জীবনের বেশিরভাগ জিনিসের মতো এক্ষেত্রেও, মধ্যপথই শ্রেষ্ঠ পথ, নিয়ন্ত্রণ হওয়া উচিত অপটিমাম। যদি দেখা যায় নিয়ন্ত্রণ বেশি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে ব্যক্তি স্বাধীনতার দিকেই ঝুঁকতে হবে। কারণ অন্যদিকে ঝোঁকার ফল ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বায়ন—যোগাযোগ ব্যবস্থা ইন্টারনেট আর নানাবিধ প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজ ও নীতি দুটোই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
দুই হাজার ছাব্বিশে আমাদের স্বাধীনতার ৫৫ বছর হলো। এই সময়কালে দুনিয়া এবং আমাদের দেশে অনেক কিছু দেখলাম আমরা। ঠান্ডা যুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান, সমাজবাদের অগ্রগতি, সমাজবাদের পশ্চাদপসরণ, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটভিত্তিক নতুন প্রযুক্তির দুনিয়া। ব্যবসায়িক বিভিন্ন বাধা আর প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার মাধ্যমে যে নতুন দুনিয়া সেটাকেই বিশ্বায়নের সফলতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। বলা হয় আমরা সব ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর বাসিন্দা। এসবের প্রভাবে দেশের মধ্যে কী দেখতে পাই আমরা? নৈতিক অবক্ষয় আর বিচ্ছিন্নতার সংকট? নৈতিক অবক্ষয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিপুলভাবে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের শত শত বছরের যৌথ জীবন প্রক্রিয়া গ্রাম সমাজ, কৌম সমাজ, কৃষিজীবী জীবনব্যবস্থার পারস্পরিক সহযোগিতা, সমাজবদ্ধ হয়ে থাকার ঐতিহ্য নানান সংকটে জাগ্রত হতে এখনও দেখা যায়। প্রাথমিক হতবিহ্বলতা কাটিয়ে মহামারি করোনা মোকাবেলায় ক্ষেত্রেও মানুষ মানুষের পাশে থেকেছে, লকডাউনের সময় বিপর্যস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, হাসপাতালে সেবা দিয়েছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতার প্রভাবের বিপরীতে আমাদের প্রাচ্য সংস্কৃতির শক্তির জায়গা নিঃসন্দেহে এগুলোই। আর আমাদের আশাবাদ সেখানেই।
সহায়ক গ্রন্থসমূহ
১। গ্রামসী ও তার রাষ্ট্র চিন্তা: আলতাফ পারভেজ
২। মেট্রোপলিটন মন: বিনয় ঘোষ
৩। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: তথাগত রায়