যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

দ্রুত বিচার হোক, ন্যায়বিচার যেন বিঘ্নিত না হয়

প্রকাশ : রবিবার, ১১ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
দ্রুত বিচার হোক, ন্যায়বিচার যেন বিঘ্নিত না হয়

যশোরে একদিনের সংক্ষিপ্ত বিচারিক আদালত বা ‘সামারি ট্রায়াল’-এর কার্যক্রম বিচারব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। প্রায় দুই মাসে শতাধিক মামলা নিষ্পত্তি এবং বহু অপরাধীর সাজা হওয়ার তথ্য মামলাজট কমানো ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আশাব্যঞ্জক। চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন, ইভটিজিং ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে দ্রুত বিচার প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু মামলার সংখ্যা কিংবা সাজার হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। এর মূল বিবেচ্য হতে হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত রাখা।

যশোরের ইকরা ইসলামিয়া ক্যাডেট মাদরাসার এক শিক্ষিকার অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক ইশতিয়াক হোসেনকে আটক এবং পরে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা সামারি ট্রায়ালের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা কথোপকথন রেকর্ড করেছিলেন, যা পুলিশ আদালতে উপস্থাপন করে। ঘটনাটি কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলাজট ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা বড় সমস্যা। মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে বিচারপ্রার্থীদের অর্থ, সময় ও শ্রমের অপচয় হয়। ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ বাড়ে, সাক্ষীরা আগ্রহ হারান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীরা জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ ও বিচার বিভাগের জনবলসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই বাস্তবতায় স্বল্প গুরুতর অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধের পর দ্রুত ও আইনসম্মত বিচার নিশ্চিত হলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

তবে দ্রুত বিচার মানে বিচারিক প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করার নামে ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি উপেক্ষা করা নয়। অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, জেরা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আসামির স্বীকারোক্তি যেন স্বেচ্ছায় ও আইনসম্মতভাবে দেওয়া হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। পুলিশের অভিযোগমাত্রই কাউকে অপরাধী বিবেচনা করা যাবে না। কারণ নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা শুধু তার ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন করে না, বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থাও নষ্ট করে। তাই পুলিশ, আইনজীবী ও বিচারক—সবার দায়িত্বশীলতা এবং বিচারিক নিরপেক্ষতা অপরিহার্য।

সামারি ট্রায়ালের কার্যকারিতা মূল্যায়নেও সতর্কতা প্রয়োজন। কতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তার পাশাপাশি কতটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কতজন খালাস পেয়েছেন এবং অভিযুক্তরা যথাযথ আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন কি না, সেসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বেকারত্ব, হতাশা, মাদকাসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয়সহ অপরাধের পেছনে থাকা কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও অপরাধ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যশোরে সামারি ট্রায়ালের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হলে তা বিচারব্যবস্থার সংস্কারে সহায়ক হতে পারে। তবে এই উদ্যোগ যেন কেবল দ্রুত সাজা প্রদানের প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, আইনি সুরক্ষা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা। মনে রাখতে হবে, বিচারব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য শুধু দ্রুত অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ায় নয়; বরং দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করায়। দ্রুত বিচার চাই, কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)