রাশেদ খান
অক্টোবরের বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা। ছাতিম ফুলের গন্ধ, শুভ্র কাশফুল, নীল আকাশ; শহুরে মধ্যবিত্তের চোখে অক্টোবর নির্মল রোমান্টিকতার ঋতু। এই রোমান্টিকতার মধ্যেই বিগত কয়েকদিন যাবৎ শহরের বিভিন্ন জায়গায় হকার উচ্ছেদ হচ্ছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি খুলে নেওয়া হচ্ছে। কারও দোকান, কারও রিকশা, আর তাদের পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগে। অনেকেই করপোরেশন আর পৌরসভার এই পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করছে, রাস্তায় রিকশা ওল্টানোর দৃশ্য যোগাচ্ছে নির্মল আনন্দ! অন্ততপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যগুলোর ভিডিও চিত্রে হাসির ইমোজির সংখ্যাধিক্য দেখে এটাই অনুমিত হয়।
শহুরে ভদ্রলোকদের কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘শহর ছেড়ে গ্রামে যাও।’ কেউ বলছেন, ‘হাল চাষ করো, মাছ চাষ করো, মুরগি পালন করো।’
কিন্তু এই উপদেশদাতাদের অনেকেই জানেন না কৃষকের এক মণ ধানের বাজারদর আর সেই ধান উৎপাদনের মোট খরচের মধ্যে কতটা ফারাক। জানেন না দিনের পর দিন সারের জন্য দীর্ঘ লাইন আর বীজ, সেচ, কীটনাশক, শ্রম ও ঋণের সুদ মিটিয়ে কৃষকের হাতে আসলে কত থাকে! তারা জানেন না মুরগির ফিডের দাম, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম কিংবা ডিম বিক্রির বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী আর কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর ক্ষমতা কতটা।
যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে উৎপাদনের উপকরণ ক্রমশ অল্প কিছু পুঁজিপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে; কৃষকের উৎপাদন ক্রমশ অলাভজনক হচ্ছে, সস্তা শ্রম এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঠাঁই নিচ্ছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে; ফুটপাত, রিকশা, ভ্যান, ছোট দোকান, দিনমজুরি। এমনকি শিক্ষিত বেকার তরুণেরাও ফুটপাতে ফুডকোর্ট কিংবা অন্য কোনো স্টাটআপ খুলে বসতে বাধ্য হচ্ছে জীবিকার তাগিদে। বলাই বাহুল্য, শখ করে কোনো শিক্ষিত তরুণ ফুটপাতে বসে না; জীবন জীবিকার নিষ্ঠুরতম বাস্তবতা তাদেরকে ফুটপাতে বসতে বাধ্য করে। সরকার এই প্রান্তিক মানুষদের কর্মসংস্থানের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত না করার কারণেই আজ তারা ফুটপাতে স্টল, হকারি কিংবা অটোরিকশাকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। টিকে থাকার এই বাধ্যবাধকতায় মানুষ যখন তার নিজের কর্মসংস্থান নিজেই সৃষ্টি করছে, রাষ্ট্র তখন অসহায় প্রান্তিক নাগরিকের সেই কর্মসংস্থানের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে সেগুলোকে ধ্বংস করছে! আর এখানেই রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের প্রশ্নটি সামনে আসে।
শহরের সৌন্দর্য দরকার, যানজট কমানো দরকার, পথচারীর চলাচল নিশ্চিত করা দরকার—এসব নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু সৌন্দর্য যদি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে গরিবের উচ্ছেদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, শৃঙ্খলা যদি কেবল শ্রমজীবী মানুষের ওপর প্রয়োগ হয়, আর নগর পরিকল্পনা যদি মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে অদৃশ্য করে দেয়, তবে সেটি নিছক নগর ব্যবস্থাপনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে শ্রেণি-রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। হয়ে ওঠে এস্থেটিক মধ্যবিত্ত আর বড়লোকের রাষ্ট্র।
ছাতিমের গন্ধে ম ম করা শহরে অক্টোবরের রাস্তায় হাজারো হকার, রিকশাওয়ালার ঝাঁঝালো মিছিল আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
কাশফুলের শুভ্রতার নিচে যদি শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের ঋণ আর হকার উচ্ছেদের কান্না চাপা পড়ে তবে সেই সৌন্দর্য আসলে অসমতার পর্দায় ঘেরা; সেই পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হবে। কারণ অক্টোবর শুধু রোমান্টিক মাস নয়, এই মাস বিপ্লবেরও! বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন, আর বুর্জোয়া-লুটেরা ব্যবস্থা থেকে শ্রমিকের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার অনুপ্রেরণার নামই ‘অক্টোবর বিপ্লব’।
লেখক: বামপন্থি ছাত্রনেতা