যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজাম্পশন পরশ্রীকাতরতাকে উসকে দেয়

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : বুধবার, ৭ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজাম্পশন পরশ্রীকাতরতাকে উসকে দেয়

স্ট্যাটাস কনজাম্পশন বা মর্জাদাভিত্তিক ভোগ কী তা জানার পূর্বে আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়ে খানিকটা আলোচনা করি। এখন থেকে বেশকিছু বছর আগেও আমরা আমাদের ঘরে তিন বেলা খাবারের বাইরে যে খাবার খেতাম তার অধিকাংশই ছিলো বাড়িতে তৈরি পিঠা, মুড়ি, মোয়া, চিড়া, চটপটি এসব। এরপর হাতে এলো পেটিস, ডেনিস, সিঙাড়া, সমুচা, মোঘলাই, চকবার, হালিম, ফুচকা, ফালুদা। তারপর স্যান্ডউইচ, বার্গার, পিৎজা পেরিয়ে আমরা এখন খাচ্ছি দোসা, বিফ সিজলিং, রেশমি কাবাব, জালি কাবাব, স্যুপ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, অন্থন। খাবারের এই যে আধুনিকায়ন হলো, এই যে বিভিন্ন ভিনদেশি খাবার আমাদের বিশেষ খাবারের তালিকায় উঠে এলো, তা কীভাবে হলো? আমার দৃষ্টিতে এর কারণগুলো—

১. আমাদের দেশ থেকে বিত্তবানেরা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে শুধু হাওয়া নয়, খাওয়ার রুচিরও বদল করে আসেন।

২. রেমিটেন্সযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ সেখানকার হোটেল/রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এবং দেশে এসে বিদেশি খাবারগুলোকে দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন।

৩. মোঘল আমল থেকেই ভোজন রসিকদের চাহিদা বিবেচনায় বাইরের দেশ থেকে পাচক/রাঁধুনি আমদানি করা হয়। আমাদের দেশে আগত বিদেশিদের খাদ্য সরবরাহের জন্য ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতেও দেশি-বিদেশি শেফ (বড় মানের রাঁধুনি) রাখা হয়। এই যে বিশেষজ্ঞ রাঁধুনি, তাদের অস্থায়ী সহকারী যারা থাকেন তারা চাকরিচ্যুত হলে স্বাবলম্বী হতেও বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে বিদেশি খাবারের হোটেল বা রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলেন।

মূল কথা এই বিদেশি খাবারগুলো বিভিন্নভাবে বিত্তবানের হাত ধরেই দেশে ঢুকেছে। তারপর ক্যাসিং ঠিক রেখে ফরেন নাম নিয়ে নিম্নমানের খাবার হয়ে পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। কেন পথে-প্রান্তরে? কেন নিম্নমান?

নতুন উদ্যোক্তারা অল্প মূলধন নিয়ে বিদেশি খাবারের প্রকৃত মান রেখে খাদ্য উৎপাদন করলেও তারা বিত্তবানদের রুচি মোতাবেক স্থান ম্যানেজ করতে পারে না। আবার স্থান পাওয়া গেলেও, পর্যাপ্ত সংখ্যক বিত্তবান পাওয়া যায় না। কাজেই টার্গেট যখন রিচফুড বিক্রি করা তখন রিচম্যান খুঁজে বের করে সে মোতাবেক রেস্টুরেন্ট স্থাপন করতে হবে। এই রিচ ফুড প্রোডাকশনের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা রিচফুড বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রচারে নেমে যখন ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করে তখন তারাই সমাজের একটি অংশকে রিচ হিসেবে সামনে তুলে নিয়ে আসে। সমাজের এই অংশ রিচ হতে বাধ্য হয়।

কীভাবে বাধ্য হয়? গলির মাথায় কফিশপ এবং ফাস্টফুডের ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ রিচফুড প্রায় গরিবের হাতের নাগালে পৌঁছে গেল। তখন গরিব তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে রিচ হতে চেষ্টা করছে। মূল কথা বিত্তবানদের বিদেশি রিচফুডের ক্যাসিং ঠিক রেখে মান কমিয়ে এনে গরিবের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে ভ্রাম্যমাণ ফাস্টফুডের দোকান। প্রথম প্রথম অনেকে শখে খেতে থাকলেও পরে তা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ধনী-গরিব সবাই এখন সপ্তাহে একটা দিন ফাস্টফুড না খেলে কেমন যেন জীবনে জুমা (শুক্রবার। এদিন বাংলাদেশের মুসলিমরা এদিন সাধারণত ভালো খাবার খায়) আসে না। অর্থাৎ এই রিচফুড/ফাস্টফুড খাওয়াটা একটা স্ট্যাটাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিত্তবানরা ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে যাচ্ছেন, মধ্যবিত্তরা শহরের মাঝারি ধরনের রেস্টুরেন্ট বা ধাবায় গিয়ে বসছেন, গরিবরা ফাস্টফুড ভ্যান বা গলির মুখের কফি শপে বা হকার্স মার্কেটের ভাবির ভ্যাবাচ্যাকা/চিকনি-চামেলি বার্গার হাটে গিয়ে বসছেন।

মানুষ ফাস্টফুড খাওয়াটাকে একটি সামাজিক মর্যাদার লেভেলে নিয়ে গেছে। যখন একদিকে মানুষের তিন বেলা খাবারের অভাব থেকে গেছে, ঠিক সেই সময়েই আরেক পাশে এইসব ফাস্টফুডের ধাবায় ক্রেতাদেরর লম্বা সিরিয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে। সমাজে নিজের মর্যাদা উপস্থাপন করছে। এই যে নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা দেখাতে মাঝে মাঝেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির ফাস্টফুড বা রিচফুড ভোগ করে, এটাই মূলত স্ট্যাটাস কনজাম্পশন । অর্থাৎ নিজ সামর্থ বা সচ্ছলতা প্রকাশে সোশ্যাল স্ট্যাটাস বা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় বা প্রদর্শনের লক্ষ্যে আমরা যে বিশেষ বিষয়াদি ভোগ করি সেটাকেই মূলত স্ট্যাটাস কনজাম্পশন বলে।

ফাস্টফুড হচ্ছে স্ট্যাটাস কনজামশনের নিম্নতর উদাহরণ। এরপর আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে ভ্রমণ, আপডেটেড আইফোন ব্যবহার, রয়্যাল এনফিল্ড বাইক, রোলেক্স ঘড়ি, জেন্টেল পার্ক, রিচম্যান, ইনফিনিটি, ক্যাটস আই ব্রান্ডের পোশাক—এইরকম নানাবিধ নামী ব্র্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখা অথবা প্রদর্শন। উপর্যুক্ত জীবনাচার আলোচনায় বুঝা যায় যে, স্ট্যাটাস কনজাম্পশন বা মর্যাদাভিত্তিক ভোগ তখনই হয়, যখন মানুষ কেবল কোনো পণ্যের কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তার জন্য তা কেনে না, বরং সমাজে নিজের সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং অবস্থান প্রদর্শন করার জন্য পণ্য ভোগ বা ক্রয় করে।

এখন বিষয় হলো, ফাস্টফুড পর্যন্ত স্ট্যাটাস কনজামশনে সমাজের নিন্মস্তরের মানুষও বিভিন্নভাবে অংশ নিতে পারছে, পোশাকের ক্ষেত্রেও রেপলিকা (কপি) ব্যবহার করে অংশ নিতে পারছে। আইফোন, মোটরবাইক, ল্যাপটপের রেপলিকা (কপি) নেই, নিম্নমান নেই। এই জায়গাতে এসে মানুষে মানুষে বিভেদ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীর, আত্মীয়ের সাথে আত্মীয়ের, বন্ধুর সাথে বন্ধুর সামাজিক মর্যাদায় ব্যবধান ফুটে উঠছে। যারা বয়স্ক বা বুঝদার তারা নিজেদের সামলে নিচ্ছে, ধনীদেরকে অভিশাপ দিয়ে, সকল সচ্ছল মানুষের অর্থকে অবৈধ এবং হারাম বিবেচনা করে নিজেদের সামলে নিচ্ছে। বিপত্তিটি বাঁধছে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীদের মধ্যে। তারা নিজের অভিভাবকের আর্থিক অবস্থা না বুঝেই বন্ধুর অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনে আকৃষ্ট হচ্ছে; চাহিদা তত্ত্ব অনুযায়ী যা তার চাহিদা হওয়ার কথা নয়, যা তার অভাব হওয়ার কথা নয়, সেই চাহিদা পূরণে তার অবিভাবক ব্যর্থ হচ্ছে এবং সেই অভাবে তারা কাতর হয়ে নানাবিধ নেতিবাচক ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছে; হতাশ হয়ে বন্ধুর অতিরঞ্জিত ব্যয়বহুল জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, অথবা তার বিলাসদ্রব্য ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া পরশ্রীকাতরতায় ভুগে নানান অনৈতিক, অসামাজিক শৃঙ্খলাপরিপন্থি কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন—সন্তান অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে, বন্ধু বন্ধুকে হত্যা করছে, চুরি-ছিনতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, হতাশায় ভুগে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বা মনোবল হারাচ্ছে।

আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে সবার জীবনে একসাথে উন্নয়ন হয় না। একটি পরিবার থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি বংশ থেকে একজনের উন্নয়ন হয়, একটি গ্রাম থেকে একজনের উন্নয়ন হয়। এই একজন একই সাথে পরিবার, বংশ, গ্রামের জন্য যেমন উন্নয়ন ও গর্বের উদাহরণ, তেমনি তার অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশনের কারণে তিনি সর্বত্র ঈর্ষার পাত্রেও পরিণত হন। তার প্রতি নজর পড়ে, অধিক দুষ্টদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারেন। একদল যখন এই উদাহরণকে আদর্শ মেনে এগিয়ে যেতে সাহস পায়, তেমনি অন্য একটি দল পরশ্রীকাতরতায় ভুগে তাকে আক্রমণ করে পিছিয়ে দিতে চায়। এটাই চরম সত্য।

স্ট্যাটাস কনজাম্পশন থাকবেই। এটা নতুন কিছু নয় তবে নিজেদের আর্থিক অবস্থা, নিজের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, আপনজনের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে তার প্রকাশ হওয়া উচিত। আমার-আপনার স্ট্যাটাস কনজাম্পশন যেন অন্যকে আহত না করে। অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উসকে না দেয়। আমাদেরই সচেতন হতে হবে। যার জীবন তার উপার্জিত অর্থে চলছে, আমারটা আমার অর্থে চালাতে হবে। কাজেই অন্যের সোশ্যাল স্ট্যাটাসের সাথে মিল রাখতে গিয়ে যেন অনটনে পড়তে না হয়। এক বেলা ভালো খেয়ে যেন বাকি দুই বেলা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে না হয়। এক জীবনে অনেক ভোগ করার সুযোগ থাকলেও সব ভোগ করা যায় না। এক জীবনে যেটুকু নিজে যোগাড় করতে পারবো, তাই আমার। অন্যেরটা দেখে অভাববোধ হলে তা অভাব নয়, সেটা পরশ্রীকাতরতা, যা জীবনের সুখ নষ্টের মূল কারণ হতে পারে। আসুন আমরা সচেতন হই, আমরা যেমন পরশ্রীকাতরতায় ভুগবো না, তেমনি আমাদের অতিরঞ্জিত মর্যাদাভিত্তিক ভোগ-বিলাসিতা দেখিয়ে অন্যের পরশ্রীকাতর স্বভাবকে উসকে দেবো না, আমরা অন্যের রোষের/ঈর্ষার শিকার হবো না।

লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)