যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

সাতক্ষীরার মিষ্টি: ঐতিহ্য থেকে বিশ্ববাজারে: চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

প্রকাশ : বুধবার, ৭ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
সাতক্ষীরার মিষ্টি: ঐতিহ্য থেকে বিশ্ববাজারে: চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

সাতক্ষীরার নাম উচ্চারিত হলে সুন্দরবন, সীমান্ত কিংবা উপকূলের কথা যেমন মনে পড়ে, তেমনি মনে পড়ে খাঁটি ছানার তৈরি সুস্বাদু মিষ্টির কথা। শতবর্ষের ঐতিহ্য, স্থানীয় খামারিদের শ্রম এবং উন্নতমানের দুধের সমন্বয়ে সাতক্ষীরার মিষ্টি আজ কেবল জেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের বিভিন্ন প্রান্ত পেরিয়ে কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই শিল্পে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

সাতক্ষীরার মিষ্টির ইতিহাস ব্রিটিশ আমলে হাজারি ময়রার হাত ধরে শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের বর্ণনায় জানা যায়। সে সময় তার তৈরি মিষ্টি লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছাতো। পরবর্তীতে সুশীল ময়রা, কেষ্ট ময়রা ও ফকির ময়রার হাত ধরে এই শিল্প সমৃদ্ধ হয়। বিশেষ করে ফকির ময়রার প্যাড়া সন্দেশ সাতক্ষীরার মিষ্টিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। খাঁটি ছানার সন্দেশ ও নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশ তাই শুধু খাদ্য নয়, সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।

এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি স্থানীয় দুধের প্রাচুর্য ও গুণগত মান। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার দুধ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে। তালার জিয়ালা ও খলিশখালিসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্বৃত্ত দুধ এবং উন্নত ফ্যাটের উপস্থিতি মিষ্টির স্বাদ ও মানকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। অর্থাৎ মিষ্টি শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদনভিত্তি—দুটিই সাতক্ষীরায় বিদ্যমান।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, উদ্যোক্তারা এখন আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশ, সন্দেশ, ল্যাংচা ও কাঁচাগোল্লা ফ্রোজেন করে কানাডায় পাঠানো হচ্ছে। বছরে প্রায় এক টন মিষ্টি বিদেশে যাচ্ছে—এটি হয়তো সামগ্রিক রপ্তানি পরিসরে অনেক বড় কিছু নয়, কিন্তু সম্ভাবনার দিক থেকে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাঙালিদের পাশাপাশি বিদেশি ভোক্তাদের কাছেও এই পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে সমস্যাও কম নয়। সাতক্ষীরায় মিষ্টি প্রক্রিয়াজাত ও ফ্রোজেন করার জন্য আধুনিক নির্দিষ্ট প্রসেসিং ইউনিট নেই। আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা, কোল্ড চেইন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থাও এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এটি চলতে থাকলে ঐতিহ্যের পণ্য থেকে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তা বিলীন হয়ে যাবে।

এ অবস্থায় ‘প্যাড়া সন্দেশ’কে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাতক্ষীরায় একটি আধুনিক মিষ্টি প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, মান পরীক্ষাগার এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি সহায়তা দেওয়া হলে এই শিল্প আরও বিকশিত হতে পারে।

সাতক্ষীরার মিষ্টি আজ ঐতিহ্য থেকে সম্ভাবনায় পরিণত হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত শিল্পে রূপ দেওয়া। হাজারি ময়রার হাতে তৈরি যে মিষ্টি একদিন লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছেছিল, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে তা আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাতক্ষীরার প্যাড়া সন্দেশ তখন শুধু একটি মিষ্টি থাকবে না—এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক খাদ্যব্র্যান্ড।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)