সম্পাদকীয়
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখা। এ বিবেচনায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ১১ জন গবেষকের বিশ্বসেরা দুই শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের সমন্বিত জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত এ স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণাক্ষেত্রে অগ্রযাত্রার পরিচায়ক। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাব্যবস্থার জন্যও আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গবেষকের সংখ্যার হিসাবে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে যবিপ্রবি। বিশ্ববিদ্যালয়টির চারজন গবেষক ক্যারিয়ার-লং এবং ১১ জন সিঙ্গেল-ইয়ার ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্র, সাইটেশন, এইচ-ইনডেক্স, গবেষণার ধারাবাহিকতা ও সহ-লেখকদের প্রভাবের মতো সূচকের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের গবেষকদের এ সাফল্য প্রমাণ করে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে।
তবে এ অর্জনকে কেবল আনন্দ ও অভিনন্দন জানানোর উপলক্ষ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি হওয়া উচিত গবেষণার মানোন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের প্রেরণা। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকৃষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থান ধরে রাখতে হলে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আধুনিক পরীক্ষাগার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মানসম্মত গবেষণা উপকরণ এবং দক্ষ জনবলের নিশ্চয়তা দরকার।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণাকে যেন কেবল প্রকাশনা ও সাইটেশনের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে তার মৌলিকত্ব, নির্ভরযোগ্যতা, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানে অবদানের মধ্যে। বাংলাদেশের কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জ্বালানি, শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। যবিপ্রবির গবেষকেরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা জরুরি।
গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। উপাচার্য গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তার বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। গবেষণা অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতা, তরুণ শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা, আন্তবিভাগীয় গবেষণা, আন্তর্জাতিক যৌথ প্রকল্প এবং গবেষণার ফলাফল উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি গবেষণায় নৈতিকতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং প্রকাশনার মান বজায় রাখার বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণার সুযোগের বিস্তার। কয়েকজন গবেষকের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষে রূপ দিতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর অংশকে গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে তোলা, যোগ্য পরামর্শক নিশ্চিত করা এবং নতুন গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা দরকার। এতে বর্তমান সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি গবেষক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের সুযোগ পাবেন।
যবিপ্রবির ১১ গবেষকের এই অর্জন তাই একটি গৌরবময় মাইলফলক, তবে একে চূড়ান্ত সাফল্য ভাবার অবকাশ নেই। এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে গবেষণার গুণগত মান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে এগিয়ে এলে যবিপ্রবি দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। বিশ্বপরিসরে অর্জিত এই স্বীকৃতি তখনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে, যখন তা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, জাতীয় উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে দৃশ্যমান অবদান রাখবে।