যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সুবর্ণভূমির কাছে আমার প্রত্যাশা

নূর ইসলাম

প্রকাশ : শনিবার, ১৭ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
সুবর্ণভূমির কাছে আমার প্রত্যাশা

দৈনিক সুবর্ণভূমি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঠকের কাছে একটি পরিচিত নাম। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যখন দেশের অধিকাংশ সংবাদপত্র সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে উঠেছিল সেই সময় গণতন্ত্রকামী মানুষের কন্ঠস্বর হিসেবে মা, মাটি ও মানুষের কথা বলার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে অনলাইন প্লাটফর্মে এই সংবাদমাধ্যমটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বুদ্ধিদীপ্ত সাংবাদিক আহসান কবীরের হাত ধরে অনলাইন প্লাটফর্মে সুবর্ণভূমির যাত্রাটি ছিলো বেশ প্রশংসনীয়।

যে সময় গণতন্ত্রকামী মানুষের কথা বলার অধিকার প্রায় খর্ব করা হচ্ছিল, আইনের নানা রকম মারপ্যাঁচে যখন জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার নস্যাৎ করে দিচ্ছিল, সেই সময় সুবর্ণভূমি নিউজ পোর্টাল বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলো। গণমাধ্যমটি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় দেশপ্রেমিক জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়। দেশের বেশির ভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল ও তার আদর্শের সৈনিকদের কাছে সুবর্ণভূমি হয়ে উঠেছিল আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক।

কিন্তু সেই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে ব্যবহার করে এই জনপদে তৎকালীন সরকারের পদলেহনকারী ব্যক্তিবিশেষের আক্রোশের শিকার হয়ে মাত্র ছয় বছরের মাথায় বিটিআরসি সুবর্ণভূমির সাইটটি একতরফাভাবে ব্লক করে দেয়। বেকার হয়ে পড়েন সুবর্ণভূমির সাথে যুক্ত বেশ কিছু সাংবাদিক। সেই প্রেক্ষাপটে এই অগণতান্ত্রিক এবং ব্যক্তি আক্রোশের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র কাগুজে প্রতিবাদ করা ছাড়া বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব ছিলো না। তাই অপেক্ষা করতে হচ্ছিল দেশে ফের কবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচার ও মানুষের বাক স্বাধীনতাহরণকারী হাসিনা সরকারের পতন ঘটবে। আর এই জন্য কম মূল্য দিতে হয়নি এদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজপথের সক্রিয় রাজনৈতিক দল এবং তাদের সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী ছাত্র-জনতাকে। হাজার হাজার মানুষের জীবনদানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বর্ষা বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে গণভবন থেকে পালিয়ে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নেন। এর আগে ও পরে শেখ পরিবারের প্রায় সকল সদস্যসহ দেশের জাতীয় মসজিদের খতিব, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন পদমর্যাদার বিচারক, পুলিশের প্রধানসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের প্রায় সকল স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ স্কুল-কলেজের সভাপতি-শিক্ষকমণ্ডলী, জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রেস ক্লাবের সভাপতি পর্যন্ত পালিয়ে যান। কারণ এই গোটা চক্রই হাসিনা সরকারকে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে নানা পন্থায় সাহায্য সহযোগিতা করেছিলো।

পরে দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অধিকারবঞ্চিত মানুষরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়ে যারপরনাই খুশি হন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার দাবি অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে বন্ধ করে দেওয়া মিডিয়াগুলো ফের চালুর সুযোগ তৈরি করে দেয়। সেই সুযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনলাইন পোর্টাল সুবর্ণভূমি ফের চালুর উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে এবার আর শুধু অনলাইনে নয়, প্রিন্ট ভার্সন এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মে আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায়ে সুবর্ণভূমি তার কার্যক্রম শুরু করেন। সকল প্রকারের আইনি পদক্ষেপ অতিক্রম করে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এই পত্রিকাটির ডিক্লারেশন দেন। শুরু হয় নতুন যাত্রা। গত ৫ অক্টোবর পত্রিকাটি এক বছর পূর্ণ করে ৬ অক্টোবর দ্বিতীয় বর্ষে পা দিলো। বর্ষপূর্তিতে পত্রিকাটির সকল পাঠক, শুভানুধ্যায়ী ও কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।

গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ এবং মুক্তচিন্তা চর্চার প্রধান বাহন। হাঁটি হাঁটি পা পা করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র যশোর থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত সুবর্ণভূমি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের একটি সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আজ পত্রিকাটির অর্জন, পাঠকের প্রাপ্তি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে।

একটি আঞ্চলিক পত্রিকার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো স্থানীয় মানুষের আবেগ, সমস্যা এবং চাহিদাকে সঠিকভাবে তুলে ধরা। দৈনিক সুবর্ণভূমি শুরু থেকেই এই নীতিতে অটল আছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

কোনো প্রভাব বা চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।

যশোরসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর শিক্ষা, কৃষি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সড়ক অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যখাতের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়মিত তুলে ধরছে পাঠকপ্রিয় সুবর্ণভূমি।

যশোর অঞ্চলের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, লালন, এস এম সুলতান, পল্লীকবি জসিম উদদীন রবীন্দ্র-নজরুলচর্চা এবং ঐতিহ্যকে প্রচার ও প্রসারে সুবর্ণভূমির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা, কৃতী শিক্ষার্থী এবং সামাজিক উদ্ভাবনগুলোকে নিয়মিত তুলে ধরে তরুণদের উৎসাহিত করে আসছে সুবর্ণভূমি।

পত্রিকার অতীত সাফল্য যেমন গর্বের, তেমনি পাঠকের ভালোবাসাই ভবিষ্যতের সফলতার চাবিকাঠি। পরিবর্তনশীল এই যুগে দৈনিক সুবর্ণভূমির কাছে পাঠকদের প্রত্যাশাও কিছুটা ভিন্ন ও বহুমুখী:

১. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রসার: ঘটনার পেছনের সত্য তুলে আনতে অনুসন্ধানী সংবাদের পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সমাজ ও প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অসঙ্গতিগুলো সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশে সুবর্ণভূমি আরও অগ্রণী ভূমিকা রাখবে—এটাই পাঠকদের অন্যতম মূল চাওয়া।

২. বর্তমান যুগ ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের। তরুণ পাঠকদের ধরে রাখতে সুবর্ণভূমির অনলাইন পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভিডিও কনটেন্টকে (মাল্টিমিডিয়া) আরও আকর্ষণীয়, দ্রুত এবং তথ্যবহুল করা সময়ের দাবি।

৩. পদ্মাসেতু চালুর পর থেকে যশোরসহ পুরো খুলনা বিভাগের অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসছে। মোংলা বন্দর, নওয়াপাড়া নৌবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সংবাদ প্রকাশ ও বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধ আরও বেশি প্রত্যাশিত।

৪. যশোর শহরের যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানা ভোগান্তি দূরীকরণে সুবর্ণভূমিকে আরও কার্যকর ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে দেখার আশা প্রকাশ করেন পাঠকমহল।

প্রদীপ্ত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় সুবর্ণভূমি শুধু একটি গণমাধ্যম নয়, এটি যশোর তথা সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, পেশাদারত্ব এবং সত্যের পথে অবিচল থেকে গণমাধ্যমটি তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে—প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই আনন্দঘন মুহূর্তে এটাই পাঠক হৃদয়ের গভীরতম আশাবাদ। একই সাথে সাংবাদিকতার নামে যারা অপসাংবাদিকতা করছেন, যারা সাংবাদিকতাকে ব্লাক মেইলিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জনগণকে জিম্মি করে নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত সেই সব সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুবর্ণভূমি আরো কঠোর ভূমিকা পালন করবে—আজকের দিনে সুবর্ণভূমির কাছে একজন পাঠক হিসেবে এটা আমার প্রত্যাশা।

সুবর্ণভূমির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং অগণিত পাঠকদের জানাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, প্রেসক্লাব যশোর

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)