দীপংকর দাস রতন
দুর্গাপূজা প্রধানত বাংলা ভাষাভাষী এলাকায় বসবাসরত সনাতন জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। হিন্দু জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হচ্ছেন মাতা দুর্গা।
পৌরাণিক বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, মহিষাসুর নামক অসুরকে বধ করে শুভশক্তির বিজয় এবং মানুষের দুর্গতিনাশ করার জন্য এই পূজার প্রচলন হয়।
আশ্বিন বা কার্তিক মাস বা শরৎকালে এই উৎসব উদযাপন করা হয়। এজন্য দুর্গাপূজাকে অনেকে শারদোৎসবও বলেন। তবে বসন্তকালেও ‘বাসন্তী পূজা’ হিসেবে এর প্রচলন রয়েছে।
মাতৃপক্ষের শুরু মহালয়া দিয়ে উৎসবের আগমনী বার্তা শুরু হয়।
মূল পূজা মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে মহাপঞ্চমী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমী পেরিয়ে দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়।
ভক্তদের দৃষ্টিতে দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ—যাঁরা মায়ের সাথে পূজিত হন।
অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে গেলে নেতৃত্ব যিনি দেন তাকে সর্বদিকে খেয়াল রাখতে হয়। এজন্যই মা দুর্গা দশভূজা। পাশব শক্তিকে পরাজিত করতে বিদ্যা, অর্থ, গণশক্তি এবং শক্তিমত্তা প্রয়োজন। বিদ্যারূপী সরস্বতী, সম্পদের প্রতিমূর্তি লক্ষ্মী, জনশক্তির প্রতীক গণেশ এবং শক্তি বা সাহসের প্রতিমূর্তি কার্তিককে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর অঞ্চলের রাজা কংস নারায়ণ প্রথম বড় পরিসরে ও আধ্যাত্মিক আনুষ্ঠানিকতায় শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলন করেন।
রাজা কংস নারায়ণ ব্যক্তিগতভাবে সূচনা করলেও দুর্গাপূজা এখন সাধারণ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষায় সর্বজনীন আদল নিয়েছে, যা বর্তমানে সনাতন ধর্মীয় বৃত্তের বাইরে উৎসব আকারে সকলের মাঝে নতুন মাত্রায় উদযাপিত হয়ে চলেছে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দুর্গাপূজা নিছক একটি আচার অনুষ্ঠান নয় বরং এটি মহাজাগতিক শক্তি, চেতনা এবং মানবজীবনের ভেতরের অন্ধকার ও আলোর সংগ্রামের একটি গভীর রূপক।
শাক্ত দর্শন অনুযায়ী, দেবী দুর্গা হলেন ‘মহাশক্তি’ বা সমগ্র মহাবিশ্বের চালিকা শক্তি। পুরুষ বা আপাত নিষ্ক্রিয় পরম সত্তার সাথে যুক্ত হয়ে এই শক্তিই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় পরিচালনা করে।
বৈদান্তিক দর্শন অনুযায়ী, নিরাকার ও অপরিবর্তনীয় ব্রহ্মকে সাধারণ মানুষের পক্ষে উপলব্ধিতে আনা কঠিন। তাই সাধনার সুবিধার্থে প্রাচীন চিন্তাবিদেরা দেবীকে মা, শক্তি এবং কল্যাণদায়ী ত্রাতা হিসাবে কল্পনা করে পৃথিবীর যাবতীয় অশুভ, পাশবিক প্রবৃত্তিকে নিবৃত্ত করার দৃশ্যমান চিত্র হিসাবে নান্দনিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন।
ঋষিদের চিন্তার নির্যাস হিসাবে মহিষাসুর হলো মোহ, অহংকার, লোভ ও অন্ধকারের প্রতীক। দেবী দুর্গার হাতে তার পতন মানে হলো ব্যক্তির ভেতরের পশুত্ব ও নেতিবাচক প্রবৃত্তির ওপর জ্ঞান, সাহস ও ন্যায়ের বিজয়।
বলা যায়, দুর্গাপূজা শুধু বাইরের কোনো রাক্ষস বধ নয় বরং মানুষের মনের ভেতরের লোভ-লালসা ও অন্ধকার দূর করার একটি আত্মিক সাধনা।
মহামায়া তত্ত্বে বোঝানো হয়েছে, এই পৃথিবীর রূপ-রসের মোহময়তার নেশায় মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তা ভুলে জাগতিক আনন্দে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা এক ধরনের মোহ।
দেবীর আরাধনার মাধ্যমেই মানুষ সেই মোহ বা মায়ার আবরণ ভেদ করে পরম সত্য বা আত্মোপলব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পান।
সময়ের বিবর্তনে দুর্গাপূজা কেবল রাজকীয় বা ব্যক্তিগত আরাধনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং বারোয়ারি বা সর্বজনীন রূপ নিয়ে এটি সাম্য, সম্প্রীতি ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকলের একতাবদ্ধতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কুমারী পূজা থেকে শুরু করে দুর্গাপূজার সকল পর্বে সমাজের নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, শক্তির কোনো লিঙ্গ বা সংকীর্ণ ভেদাভেদ নেই; সব সত্তার মাঝেই সেই দিব্য শক্তি বিরাজমান, যে শক্তির ইতিবাচক ব্যবহার পৃথিবীকে চমৎকার আনন্দময় স্বর্গ সুখ দিতে পারে।
প্রখ্যাত দার্শনিক ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী বলেছেন, সকল বস্তুতে যিনি মাতৃরূপে বিরাজিতা, তিনিই বিশ্বজননী মা দুর্গা। ব্রহ্মাণীরূপে ইনি সৃষ্টি করেন। বৈষ্ণবী শক্তিরূপে ইনি পালন করেন। শিবানীরূপে ইনিই বস্তুর পরিণতি বিধান করে শিবাধীন বা মঙ্গলাধীন করেন।
মায়ের বদনে শিব, বাহুতে বিষ্ণু , চরণে ব্রহ্মা। মায়ের স্তন-যুগলে চন্দ্র, কেশে যম, কটিতে ইন্দ্র। বরুণের তেজে মায়ের উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, কুবেরের তেজে নাসিকা। সূর্যের তেজ মায়ের পদাঙ্গুলীতে, বসুগণের তেজ করাঙ্গুলীতে, অগ্নির তেজ তিন নয়নে।
মা নিখিল দেবগণের শক্তিসমূহের মূর্তি। মায়ের একাধারে সকল শক্তি। হিন্দু শাস্ত্রে বহু দেবতা। বস্তুত তাঁরা সকলেই মা দুর্গার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সকলেই তাঁর হতে ব্যক্ত আবার তাঁতেই নিমজ্জিত। মা বিশ্বেশ্বরী জগজ্জননী পরমেশ্বরী।
মা এত বড় শক্তিশালিনী হয়েও স্নেহময়ী। নিরন্তর মায়ের নয়ন হতে সন্তানের প্রতি করুণাধারা বর্ষিত হচ্ছে। যুদ্ধে যখন তিনি ভীষণা, তখনও তিনি করুণায় কৃপাময়ী। এই মহা কারুণ্যই তাঁর নিখিল মাতৃত্বের উৎস।
মা দুর্গা আরাধনার ভক্তি পর্বটি সনাতনি জনগোষ্ঠীর কিন্তু উৎসব ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকলের। দুর্গাপূজার এই আনন্দোৎসব আমাদের এই মহামন্ত্রে দীক্ষিত করুক, আমরা যেন বাংলাদেশকে এক অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, যশোর জেলা শাখা