সম্পাদকীয়
ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে মানব পাচার
উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ তরুণদের যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়ার চেয়ে বড় কোনো অপরাধ হতে পারে না।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের তরুণ রাজন হোসেনের জীবনের সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি মানবপাচারকারীদের হিংস্রতা ও নির্মমতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। জমি বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে দশ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন যে তরুণ, মাসে ৭৫ হাজার রুবল উপার্জনের আশায়; তাকে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার ওরেনবুর্গে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের সম্মুখ সমরে ঠেলে দেওয়া হয়। ড্রোন হামলায় পঙ্গুত্ববরণ করে এবং সহযোদ্ধাদের অকালমৃত্যু প্রত্যক্ষ করার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দেশে ফিরেছেন বটে, তবে তার পেছনে রেখে এসেছেন এক অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি আর বয়ে বেড়াচ্ছেন ঋণের পাহাড়। এই ঘটনাটি কোনো একক অপরাধের উদাহরণ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের অংশ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘জাবালে নূর’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির ছত্রচ্ছায়ায় এই আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রটি প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে উচ্চ বেতনে চাকরির আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যায় এবং সেখানে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে যেতে বাধ্য করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৩০ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে অন্তত ২০ তরুণ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। এই অকালমৃত্যুগুলোর দায় পুরোপুরি সেই দালাল ও প্রতারক এজেন্সিগুলোর, যারা সামান্য আর্থিক লাভের জন্য এ দেশের যুবকদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাজনের মতো যারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরছেন, তারা পঙ্গুত্ব ও গভীর মানসিক ট্রমা নিয়ে এসেছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি এজেন্সি এমন বিপজ্জনক কাজ করতে পারলো, তা এক রহস্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্প্রতি ঢাকা ও ফরিদপুরে অভিযান চালিয়ে এজেন্সির মালিক মিজানুর রহমান এবং স্থানীয় দালাল আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে। এটি নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু কেবল গ্রেপ্তারই শেষ কথা হতে পারে না। অতীতে মানবপাচারের বহু ঘটনায় দেখা গেছে, মূল হোতারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় অথবা বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে হতে একসময় আড়ালে চলে যায়। রাজনের পরিবারের মতো ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়, তার জন্য এই মামলার তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, নিখুঁত ও দ্রুত। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো চক্র বা এজেন্সি এ ধরনের অপকর্ম করার দুঃসাহস না দেখায়।
একই সাথে, পাচার হওয়া অন্য বাংলাদেশি নাগরিকরা, যারা এখনো রাশিয়ায় অবরুদ্ধ বা বিপজ্জনক অবস্থায় আছেন, তাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাশিয়ান নারী চিকিৎসকের মানবিক সহায়তায় রাজন ট্রাভেল পারমিট নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন—এটি তার ব্যক্তিগত ভাগ্য হতে পারে, কিন্তু কূটনৈতিক পর্যায়ে জোর তৎপরতা না থাকলে অন্য বন্দী বা ভুক্তভোগী বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর আগে কাজের প্রকৃত প্রকৃতি যাচাইকরণ এবং বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
রাজন ও তার মতো ভুক্তভোগীরা কেবল পাচারের শিকারই হননি, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও পুরো নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। যে যুবকরা পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পা বাড়িয়েছিলেন, আজ তারা পঙ্গুত্ব বহন করছেন আর ঋণের বোঝা টানছেন। রাষ্ট্র ও সমাজকে এদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং পাচারকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের তরুণদের রক্তের ওপর ভর করে কোনো মানবপাচারকারী চক্র পার পেয়ে যেতে পারে না; এই ধরনের জঘন্য চক্রকে চিরতরে নির্মূল করতেই হবে।