যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আধপাগলের জীবন

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
আধপাগলের জীবন

আমরা চলতে ফিরতে রাস্তায় অনেক পাগল দেখি। এসব ভবঘুরে পাগল, এদের অভিভাবক নেই অথবা থাকলেও এরা অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পাগল এবং সুস্থ মানুষের মধ্যে যে বিস্তর দূরত্ব আছে, তার মাঝের স্তরটিই আধপাগল। এই আধপাগলেরা সম্পূর্ণ পাগল না হলেও উপযুক্ত পরিবেশ (ত্যক্তবিরক্ত হলে) পেলে পাগলামিতে বদ্ধপাগলকে ছাড়িয়ে যায়। এরা রাস্তায় ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ায় না। অধিকাংশই মায়ের ছায়ায় থাকে। যত্নে থাকে, যাতে ভেতরের ক্ষেপাটে বোধটা বেরিয়ে না আসে। অধিকাংশ আধপাগলকে সহজ সরল বলা হয় অথবা এর উলটো। অর্থাৎ অধিক সরলদের আধপাগল বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

এরা মূল রাস্তায় না এলেও গ্রামের মেঠো রাস্তায় অথবা শহরের গলির মাথায় যে দোকান থাকে তার আশপাশে এদের দেখা যায়। এরা ধীরস্থির গতিতে চলে। কারো পথ রোধ করে না। পাগলের মতো এরা কারো গায়ে থুথু ছিটিয়ে দেয় না, ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে পালায় না, কারো কপালে ইট মারে না, হঠাৎ উলঙ্গ হয়ে অন্যকে লজ্জাও দেয় না। তবুও এদেরকে সাধারণ মানুষ ত্যক্ত করে। এরা কতোটা বোকা বা চালাক হলো সাধারণ মানুষ এদেরকে নেড়ে তা যাচাই করে। ফলাফল হিসেবে যখন ক্ষেপে গিয়ে এরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তখন এই সাধারণেরাই আখ্যা দেয় এরা ‘আধপাগল’।

পাগল এবং আধপাগল উভয়ই মানসিক প্রতিবন্ধী হলেও এদের মধ্যে কিছু দৃশ্যমান পার্থক্য আছে-

১. পাগল জানে না যে, সে পাগল। সে জানে সে ওই রকমই। তার জ্ঞান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে যে পাগল নয় তার প্রমাণ তাকে দিতে হয় না। পাগলের কোনো সাধারণ বোধ না থাকায় ওদের সাধারণ দুঃখবোধও নেই। আধপাগল মানে না যে, সে কিছুটা পাগলাটে। সে ভাবে যে, মানুষ তাকে অকারণেই পাগল ভাবে। সে যে পাগল নয় তা প্রমাণ দিতে তারা কিছুটা ধৈর্যও ধরে। এদের দুঃখের তীব্রতা চরম (ক্ষ্যাপাটে)।

২. পাগল যখন বিয়ের ভাবনা ভাবতেই পারে না বা বিয়ের ধার ধারে না তখন আধপাগল কিছুটা বয়স হলেই বিয়ের বায়না ধরে এবং বিয়েতে বিলম্ব হলে পুরো পাগল হওয়ার দশায় পৌঁছায়। তারপর অভিভাবকেরা পাগলামি সারাতে আধপাগলের বিয়ে দেয়। অধিকাংশের ধারণা যুবক-যুবতীর বহু জটিল ও কঠিন শারীরিক ও মানসিক রোগের একমাত্র মহৌষধ হচ্ছে বিয়ে। তারপর একজোড়া আধপাগল মিলে পূর্ণ পাগলে রূপ নেয়।

৩. মানুষ পাগলকে অতোটা ক্ষেপায় না যতটা আধপাগলকে ক্ষেপায়। কিশোর, যুবক, এমনকি মুরুব্বিরাও আধপাগলকে ‘এই বিয়ে করবি?’ বলে ক্ষেপায়। পাগলের সাঁকো নাড়িয়ে দেয়। তারপর বিয়ের জন্য আধপাগল গালিগালাজ করে মুরুব্বির মান খেয়ে দেয়। তবুও মানুষ আধপাগলের কাছে এসে তার সাথে পাগলামি করে একটা পাগলা হাওয়ার সুখ পায়।

সাধারণ পুরুষ যারা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নয় অর্থাৎ পাগল বা আধপাগল নয় তারাও বিয়ে করে। বিয়ে করে ভালোবেসে, শখে, পুলকে, ঠ্যালায় অথবা সামাজিকতায়। বিশেষ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে বিয়ের পর বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষের বুদ্ধি লোপ পায়। এদের বিচার শক্তি হারিয়ে যায়। এরা মা ও স্ত্রী—কোনো পক্ষের কথায় একমত হতে পারে না। সিটি কর্পোরেশনের রাস্তার মাঝে যেমন বিভাজক থাকে তেমনি ডিভাইডার ধরে এরা বেরিয়ে যেতে চায়। যাতে কোনো গাড়ির চলাচলেই বিঘ্ন না ঘটে। কোনো গাড়িই যেন তার উপরে না ওঠে। তবুও পুরুষ পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে উভয়ের কাছে বিবেচিত হয়। এরা মায়ের কাজকে সঠিক বললে স্ত্রী এবং স্ত্রীর সখীরা স্বামীর ‘বিচার শক্তি নেই’ বলেই ধরে নেয়, আর বউয়ের কাজকে সঠিক বললে মা এবং মায়ের সহচরেরা ধরেই নেয় বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটা বিয়ের পর ‘আহাম্মকে’ পরিণত হয়েছে। রাজ্যের সবাই যে রাজাকে মান্য করে অন্দর মহলে সে বউপাগল, সংসারপাগল অথবা মাপাগল হিসেবে বেঁচে থাকে। এই আধপাগল পুরুষের সুখ খাঁচায় পোষা ময়নার কণ্ঠে আটকে থাকে।

ভিজে বিড়াল হিসেবেও সাধারণ পুরুষের বেশ পরিচিতি আছে। এই ভিজে বিড়াল জলে ভেজা নয়। শর্ষের খাঁটি তেলে ভেজা। যাতে কথা গায়ে পড়লেও লেগে না থাকে। কেউ যেন কোনো পক্ষে না নিতে পারে। পুরুষেরা বোঝে যে, সে ভিজে বিড়াল হলে তবেই সংসারভেলা অনুকূলে ভাসে। তারপর এতেও যখন কাজ হয় না তখন পুরুষ খানিকটা ক্ষ্যাপাটে হয়ে যায়। ওই আধপাগলা টাইপ হয়ে যায়। ভবঘুরে পাগলের মতো না হলেও আধপাগলের মতো বিবাহিত পুরুষকে হাবা হয়ে রাস্তায়, রাস্তার পাশের টঙ ঘরে আনমনে বকতে দেখা যায়, ফুরিয়ে আসা সিগারেটের ফিল্টার টানতে দেখা যায়, চায়ের কাপে অনেকটা চা রেখেই এদের চা খাওয়া শেষ হয়ে যায়, কী জানি কী ভাবনায় এরা কোথায় হারিয়ে যায়! সংসার সাগরে এরা হাবুডুবু খেয়ে তীর হাতড়াতে হাতড়াতে মোহনায় ঘুর্ণি খায়। এরা পাগল নয়, কিন্তু সুযোগ পেলে এরা পাগলকে ছাড়িয়ে যায়। অধিকাংশ পুরুষই তাই। এরা সব বাধা ছাড়িয়ে যায় অথবা দমে গিয়ে নারীসঙ্গ ছাড়ে। তারপর আইনি জটিলতায় পড়ে এরা জেলখানায় (পাগলাগারদের পরিবর্তে) আশ্রয় পেলেও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আইনের আশ্রয় চায় না। যেখানে নারী নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তিতে আদালত হিমশিম খাচ্ছে সেখানে পুরুষেরা দীর্ঘকাল মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও সামাজিক কারণে বিচার চাইতে পারে না। এই পুরুষ নির্যাতন তাদের কাছে অনেকটা গোপন রোগের মতো। দীর্ঘকাল রোগ বয়ে বেড়ালেও ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পুরুষেরা লজ্জা পায়। পুরুষেরাও যে পরিবারে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় এ কথা প্রকাশ পেলে পৌরুষ হারানোর ভয় থেকে যায়। ভয়ে এরা দীর্ঘকাল, ক্ষেত্রবিশেষে আজীবন কলুর বলদ হয়েই সংসারের চাকা ঘুরিয়ে যায়।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)