সম্পাদকীয়
পানিতে ডুবে মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের এক নীরব সংকট। বিশেষ করে শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যু মানুষের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। আসলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সতর্কতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতারও নির্মম প্রতিফলন।
সাতক্ষীরা জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত পুকুর, নদী, খাল ও মাছের ঘেরে ডুবে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু গভীর উদ্বেগেরই ব্যাপার। নিহতদের মধ্যে ১৯ জনই শিশু। পানিতে ডুবে একের পর এক এমন প্রাণহানি শুধু সাতক্ষীরার চিত্রই নয়, সারা দেশের অবস্থাও প্রায় একই। কিন্তু এভাবে আমাদের শিশুরা মরতে পারে না। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।
সাতক্ষীরার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে কিংবা গোসলের সময়। বাড়ির পাশের পুকুর, খাল বা জলাশয় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও শিশুদের জন্য এগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির উৎস। বিশেষ করে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা বিপদ সম্পর্কে সচেতন নয় এবং অল্প পানিতেও ডুবে যেতে পারে। অভিভাবকের সামান্য অসতর্কতা কিংবা কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়াও যে কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ।
উদ্বেগের বিষয়, এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা বারবার ঘটলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে পানিতে ডুবে এক হাজার ৩১১ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে এত হাজার ১৮৪ জনই শিশু। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৮২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অসীম শোক এবং অপূরণীয় ক্ষতি। অথচ যথাযথ সতর্কতা, নিরাপদ পরিবেশ ও জীবনরক্ষায় দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এসব মৃত্যুর অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। শিশুদের কখনোই পুকুর, নদী, খাল কিংবা অন্য কোনো জলাশয়ের পাশে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সর্বক্ষণিক ও নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির পাশের জলাশয় নিরাপদ করা, ঝুঁকিপূর্ণ পুকুরের চারপাশে বেড়া দেওয়া, জলাশয়ে প্রবেশের অনিরাপদ পথ বন্ধ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়ির কাছাকাছি থাকা পুকুর ও ঘেরগুলোকে শিশুবান্ধব নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
শিশুদের সাঁতার শেখানোও পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পানিতে বিপদ শনাক্ত করা, নিরাপদ আচরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ জন্য বিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিশু একাডেমি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সাতক্ষীরার দেবহাটা ও শ্যামনগরে বাস্তবায়িত আইসিবিসি প্রকল্পের আওতায় ৫০টি পুকুরের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০০ শিশুকে সাঁতার শেখানো এবং অরক্ষিত জলাশয়ে সুরক্ষাবেষ্টনী দেওয়ার অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকল্পটি ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার পর জেলায় নতুন কোনো কার্যক্রম না থাকা উদ্বেগজনক। সফল উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেলে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই প্রকল্পটির দ্বিতীয় ধাপ দ্রুত চালু করা এবং অন্যান্য উপজেলায়ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রতিটি মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিরোধে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার। আর কোনো পরিবার যেন অসতর্কতার কারণে সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে না পড়ে—এই লক্ষ্যেই গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ জলাশয়, সাঁতার শেখার সুযোগ এবং শিশুবান্ধব পরিবেশ। একটি শিশুর জীবন রক্ষা করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।