তসলিম শিমুল
সত্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসার কথা আমরা প্রায়ই বলি। সত্যের পক্ষে থাকার অঙ্গীকার করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, ন্যায়বিচারের দাবি তুলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সত্যের প্রতি আমাদের এই ভালোবাসা অনেক সময় শর্তসাপেক্ষ। সত্য যতক্ষণ নিজের পক্ষে থাকে, ততক্ষণ তা গ্রহণ করি। কিন্তু সেই সত্য যখন নিজের ভুল, স্বার্থ, অবস্থান কিংবা প্রিয় মানুষের অসংগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখনই শুরু হয় আপত্তি, অস্বীকার আর যুক্তির মারপ্যাঁচ।
মানুষ আসলে সত্যকে কতটা ভালোবাসে, আর নিজের পছন্দের সত্যকে কতটা আঁকড়ে ধরে—সেই প্রশ্নটিই আজ বড় হয়ে উঠেছে।
সত্য কখনো কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কারও পদ, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্থবিত্ত সত্যকে নিজের মতো করে বদলে দিতে পারে না। কিন্তু সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, সত্যের চেয়ে সত্যের বক্তার পরিচয় বেশি গুরুত্ব পায়। কে কথাটি বলছেন, তিনি আমার আপনজন নাকি প্রতিপক্ষ, আমার মতাদর্শের অনুসারী নাকি বিরোধী—এসব বিবেচনাই যেন সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
একই কথা নিজের পক্ষের কেউ বললে তা হয়ে ওঠে সাহসী উচ্চারণ, আর প্রতিপক্ষ বললে সেটিই হয়ে যায় ষড়যন্ত্র। নিজের ভুল আড়াল করতে আমরা শত যুক্তি দাঁড় করাই, অথচ অন্যের সামান্য ভুলকেও বড় করে দেখি। নিজের স্বার্থে নীরব থাকাকে বলি কৌশল, আর অন্যের নীরবতাকে বলি কাপুরুষতা। এই দ্বিমুখী মানসিকতাই সত্যের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর প্রতিফলন আরও স্পষ্ট। আমরা চাই দুর্নীতির বিচার হোক, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন আমাদের পছন্দের না হন। আমরা চাই জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, তবে সেই জবাবদিহির মুখোমুখি যেন আমাদের ঘনিষ্ঠ কেউ না হন। আমরা চাই সংবাদমাধ্যম সত্য প্রকাশ করুক, তবে সেই সত্য যেন আমাদের বিশ্বাস ও স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায়। অর্থাৎ, আমরা ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু অনেক সময় নিজের জন্য আলাদা মানদণ্ড রেখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও প্রকট করেছে। যাচাই না করেই পছন্দের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া, অপছন্দের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা ভিন্নমত প্রকাশকারীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা এখন অনেকের কাছে স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। তথ্যের চেয়ে আবেগ, যুক্তির চেয়ে পক্ষপাত এবং
সত্যের চেয়ে দলীয় আনুগত্য যখন প্রাধান্য পায়, তখন সমাজে বিভাজন বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা কমে যায়।
তবে সব সত্যই যে নির্ভুলভাবে জানা বা উপস্থাপন করা হয়, তা-ও নয়। মানুষের স্মৃতি ভুল করতে পারে, তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে, বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকতে পারে। তাই সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ শুধু নিজের বিশ্বাসে অনড় থাকা নয়; বরং তথ্য যাচাই করা, যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং প্রয়োজনে নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা অর্জন করা। নিজের বিশ্বাসের বিপরীতে কোনো তথ্য এলে সেটিকে যাচাই করার সাহসই প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয়।
সত্যকে গ্রহণ করার জন্য সাহস লাগে। কারণ সত্য কখনো কখনো আমাদের অহংকারে আঘাত করে, ভুলের মুখোমুখি দাঁড় করায়, প্রিয় ধারণাকে ভেঙে দেয়। কিন্তু ভুল স্বীকার করা পরাজয় নয়; বরং নিজেকে সংশোধন করার শক্তি। যে মানুষ নিজের ভুল বুঝেও তা অস্বীকার করে, সে সাময়িকভাবে নিজের অবস্থান রক্ষা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে আমাদের এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেখানে সত্যের মূল্য নির্ধারিত হয় কে বলেছে তার ভিত্তিতে। সত্যকে গ্রহণ করতে হবে তার প্রমাণ, যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল কিংবা সামাজিক সংগঠন—কারও ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের মানদণ্ড আলাদা হতে পারে না।
পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র এই চর্চা জরুরি। সন্তান ভুল করলে তাকে নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখাতে হবে; প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তার প্রতিকার করতে হবে; আর জনপরিসরে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে যুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে—আমি কি সত্যিই সত্যকে ভালোবাসি, নাকি শুধু সেই সত্যকেই ভালোবাসি, যা আমার পক্ষে যায়?
এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর সহজ নয়। কারণ অন্যের ভুল খুঁজে পাওয়া সহজ, নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়া কঠিন। অথচ সত্যের প্রতি প্রকৃত আনুগত্য শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই, যখন আমরা নিজের স্বার্থ, অহংকার ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখি।
সত্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনই, যখন তা নিজের বিরুদ্ধে যায়। যে মানুষ, যে প্রতিষ্ঠান কিংবা যে সমাজ সেই সত্যকেও গ্রহণ করার নৈতিক সাহস রাখে, প্রকৃত অর্থে তারাই সত্যের অনুসারী। অন্যথায় সত্যের বন্দনা যতই হোক, তা শেষ পর্যন্ত নিজের স্বার্থ রক্ষার এক অলংকারমাত্র।
কারণ সত্যকে সবাই শুনতে চায়, কিন্তু সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস সবার থাকে না।