সম্পাদকীয়
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, জনগণের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তিও নেই—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সত্য নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ও দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, বিরোধী মত দমন, ভিন্নমতাবলম্বীদের শত্রু বিবেচনা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে নির্বিচার বল প্রয়োগে ব্যবহার করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার নির্মম সাক্ষী হয়ে আছে আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাস।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামিদের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে জুলাইয়ের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এই রায় কেবল কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
একটি রাজনৈতিক দল যখন জনগণের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে নিজেকে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিক মনে করতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা জন্ম নেয়। বিশেষত শাসকগোষ্ঠী যখন বিরোধী মতকে সহ্য করতে পারে না, সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, তখন গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের অপরাজেয় ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, জনগণকে দীর্ঘদিন ভয় দেখিয়ে, দমন-পীড়ন চালিয়ে কিংবা বন্দুকের নল তাক করে দমিয়ে রাখা যায় না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে সর্বস্তরের মানুষের গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। সেই গণবিক্ষোভ মোকাবিলায় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী যে মাত্রাহীন বল প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার। নির্বিচারে গুলি, প্রাণহানি, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ মানুষের ন্যায্য দাবি ও ক্ষোভকে অস্ত্রের মুখে স্তব্ধ করা যায়নি। বরং সেই দমন-পীড়নই গণঅভ্যুত্থানকে আরও বিস্তৃত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটিয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ক্ষমতায় যাওয়া কোনো দলের জন্য জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স নয়। রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সব নাগরিকের। বিরোধীদল, ভিন্নমতাবলম্বী, সংবাদমাধ্যম কিংবা সাধারণ নাগরিকের অধিকার হরণ করে কোনো শাসনব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জবাবদিহি, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হতে হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত্তি।
জুলাই-আগস্টে যারা হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, তাদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তবে বিচারের নামে কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানি, মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সম্মিলিত শাস্তির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের ভিত্তি হতে হবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ করে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো লৌহমানব বা লৌহমানবীর ক্ষমতা জনগণের সম্মিলিত শক্তির ঊর্ধ্বে নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অপরাজেয় মনে করা শাসকেরাও জনগণের প্রতিরোধের মুখে পরাজিত হয়েছেন। বাংলাদেশেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এই অভ্যুত্থানকে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; এর মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে, তা ধারণ করতে হবে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে তখনই, যখন ভবিষ্যতে আর কোনো শাসক জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর সাহস দেখাতে পারবেন না।