সম্পাদকীয়
কৃষকের ঘাম, শ্রম ও স্বপ্ন মিশে থাকে প্রতিটি ফসলের সঙ্গে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষককে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো রোগবালাই, আবার কখনো উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। এর মধ্যেও কৃষক আশায় বুক বাঁধেন, ঋণ করে, জমি বন্ধক রেখে কিংবা গবাদিপশু বিক্রি করে ফসল ফলান। অথচ সেই ফসলই যদি রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা কেটে ধ্বংস করে দেয়, তাহলে তা তার জীবন-জীবিকা, পরিবার ও ভবিষ্যতের ওপর এক নির্মম আঘাত।
যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম মনিরের ঘটনা এরই একটি দৃষ্টান্ত। প্রায় সাড়ে চার বিঘা জমিতে বিভিন্ন সবজির চাষ করেছিলেন তিনি। ছাগল-গরু বিক্রি এবং বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্বপ্নের সবজিখেত। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের কোনো এক সময়ে দুর্বৃত্তরা তার প্রায় আড়াই হাজার টমেটোগাছ কেটে দিয়েছে। নষ্ট করেছে লাউসহ অন্যান্য ফসলও। এতে তিন লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই চাষাবাদ। ফলে এ ঘটনা পরিবারটিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন কৃষকের সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকলেও কি তার জীবিকার ওপর এমন আঘাত করার অধিকার কারও রয়েছে? আর যদি কোনো শত্রুতার কারণই না থাকে, তাহলে এমন নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা কী? ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা নিছক বিকৃত মানসিকতা—যে কারণেই ফসল ধ্বংস করা হোক না কেন, এটি গুরুতর অপরাধ। এর মাধ্যমে শুধু একজনের সম্পদ নষ্ট করা হয় না, দেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের অপরাধের শিকার হন মূলত প্রান্তিক ও গরিব কৃষকরা। যাদের ফসল নষ্ট হলে বিকল্প আয়ের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। অনেকেই এনজিও, ব্যাংক কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ফসল বিক্রি করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং পরিবারের ভরণপোষণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এক রাতের নাশকতায় সেই পরিকল্পনা ভেঙে পড়লে তাদের সামনে ঋণের বোঝা, খাদ্যসংকট ও সামাজিক অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। মনিরুলের পরিবারের উদ্বেগ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবারের সংকট নয়; এটি দেশের অসংখ্য কৃষকের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি।
এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রথমেই প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। মনিরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও কারা, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ফসল ধ্বংস করেছে, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যা-ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু তদন্তের আশ্বাস কিংবা সাময়িক তৎপরতায় এ সমস্যার সমাধান হবে না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ কৃষকের ফসলের ক্ষতি করার সাহস না পায়।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যশোরের উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস ইতিবাচক। তবে সেই আশ্বাস দ্রুত বাস্তব সহায়তায় রূপ নিতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে মনিরুল ইসলামকে আর্থিক অনুদান, কৃষি উপকরণ ও প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন সহায়তা দিতে হবে। তার ঋণের কিস্তি পরিশোধে সাময়িক ছাড় বা পুনঃতফসিলের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষক শুধু নিজের পরিবারের জন্য ফসল ফলান না; তিনি দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেন। সেই কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল যারা ধ্বংস করে, তারা কার্যত সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করে। তাই কৃষকের ফসলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তার ন্যায্য অধিকার। মনিরুল ইসলামের ক্ষতিপূরণ ও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেই দায়িত্ব পালনের সূচনা হোক। কৃষকের মাঠে ফসল ফলুক, প্রতিহিংসার আগুন নয়—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।