যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি হোক যত্নে

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : শনিবার, ৩১ অক্টোবর,২০২৬, ১১:০০ পিএম
শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি হোক যত্নে

আমরা বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা করি, সন্তানের ভবিষ্যৎ সাজাই, সম্পদ অর্জনে জীবন কাটিয়ে দিই। কে আমাদের পরে সম্পত্তির মালিক হবে, সন্তান কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, ব্যাংকে কত টাকা জমা থাকবে—এসব নিয়ে আমাদের ভাবনার শেষ নেই। অথচ যে সত্যটি জীবনের শুরু থেকেই আমাদের পিছু নিয়ে হাঁটে, সেই মৃত্যুকে নিয়ে ভাবতে গেলেই কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করি। মনে করি, মৃত্যু নিয়ে কথা বলা বুঝি অমঙ্গলের লক্ষণ!

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মৃত্যু নিয়ে কথা বললে মৃত্যু এগিয়ে আসে না, আর মৃত্যু নিয়ে নীরব থাকলেও তা দূরে সরে যায় না। তাহলে জীবনের এই অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে আমাদের এত সংকোচ কেন?

মৃত্যু জীবনের এমন এক বাস্তবতা, যার সামনে ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাবান-নিরীহ, পরিচিত-অপরিচিত—সবাই সমান। পদ-পদবি, অর্থবিত্ত, সামাজিক প্রতিপত্তি কিংবা ক্ষমতার দাপট কোনোটিই মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। অথচ জীবদ্দশায় আমরা অনেক সময় এসব পরিচয় নিয়েই অহংকার করি, মানুষকে ছোট করি, সম্পর্ক নষ্ট করি, অন্যের অধিকার হরণ করি। ভুলে যাই, একদিন এই পরিচয়গুলোর সবই পেছনে ফেলে চলে যেতে হবে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)। ইসলাম আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় শুধু পরকালের প্রস্তুতির জন্য নয়, বরং দুনিয়ার জীবনকে সৎ, সুন্দর ও দায়িত্বশীল করে তোলার জন্যও। মানুষের হক আদায় করা, ঋণ পরিশোধ করা, অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং ন্যায়ের পথে চলা—এসবই মৃত্যুর প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু আমাদের সমাজে মৃত্যুর প্রস্তুতি বলতে অধিকাংশ মানুষ কেবল জানাজা, কাফন ও দাফনের বিষয়গুলোই বোঝেন। অথচ এর পরিধি আরও বিস্তৃত। নিজের দায়িত্বগুলো গুছিয়ে রাখা, পরিবারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো, বৈধ উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা মিটিয়ে নেওয়াও এই প্রস্তুতির অংশ।

মৃত্যুর পর অসহায় হয়ে পড়ে যে পরিবার

একবার ভেবে দেখুন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ মারা গেলেন। শোক সামলানোর আগেই স্বজনদের সামনে এসে দাঁড়ালো নানা প্রশ্ন। ব্যাংকে টাকা আছে কি না, কোথায় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রাখা, কার কাছে কত টাকা পাওনা, কোথাও ঋণ রয়েছে কি না—কিছুই পরিবারের সদস্যদের জানা নেই। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হলো অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও দাপ্তরিক জটিলতা।

এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অস্বাভাবিক নয়। অথচ জীবদ্দশায় সামান্য সচেতনতা অনেক সমস্যাই কমিয়ে দিতে পারে। নিজের গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র কোথায় রয়েছে, কী কী আর্থিক দায়-দায়িত্ব আছে এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্য কীভাবে পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে বিশ্বস্ত স্বজনকে অবহিত করে রাখা দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

একইভাবে ঋণ ও মানুষের পাওনা যথাযথভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা, বৈধ উত্তরাধিকারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়টি নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমরা সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যেতে চাই, কিন্তু কখনো কখনো এমন অগোছালো পরিস্থিতি রেখে যাই, যা তাদের মধ্যে বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ, আত্মীয়দের মধ্যে দূরত্ব কিংবা অসহায় উত্তরাধিকারীর অধিকার হারানোর ঘটনা আমাদের সামাজিক বাস্তবতারই অংশ।

প্রশ্ন হলো, যে সম্পদ অর্জনের জন্য জীবনের এতটা সময় ব্যয় করলাম, সেই সম্পদ কি আমাদের অনুপস্থিতিতে প্রিয়জনদের শান্তির বদলে অশান্তির কারণ হবে? সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা কি কম গুরুত্বপূর্ণ?

শেষ বিদায়েও কেন থাকবে বৈষম্য

মৃত্যুর পর কোনো মানুষের শেষ বিদায় কতটা মর্যাদাপূর্ণ হবে, তা যেন তার জীবদ্দশার আর্থিক সামর্থ্য কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে। কিন্তু বাস্তবে কখনো কখনো শেষ বিদায়ের আয়োজনেও বৈষম্য চোখে পড়ে।

কোথাও সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলে, কোথাও আবার অর্থের অভাবে মৃত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোকাহত পরিবারকে এমন সব সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা পালনের চাপে পড়তে হয়, যার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন।

এখানেই আমাদের সামাজিক বিবেকের প্রশ্ন।

মৃত্যুর সময় একটি পরিবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে স্বজনদের সহমর্মিতা ও সহযোগিতা। সেই সময় তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করা, লোকদেখানো আয়োজনের প্রত্যাশা করা কিংবা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে শেষ বিদায়ের মর্যাদা মেলানোর চেষ্টা কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে না।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফন যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। কিন্তু এসবের সঙ্গে লোকদেখানো প্রতিযোগিতা কিংবা অযথা ব্যয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। মৃত ব্যক্তির প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রকাশ পায় ধর্মীয় বিধান পালন, মর্যাদা রক্ষা এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

মৃত্যুর পর মানুষের পরিচয় তার রেখে যাওয়া সম্পদ নয়; তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়াই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে থাকে।

শেষ বিদায় শুধু পরিবারের নয়, সমাজেরও দায়িত্ব

আমাদের দেশে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সমৃদ্ধ সামাজিক ঐতিহ্য রয়েছে। কারও মৃত্যু হলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন, স্বজনেরা একত্র হন, পরিচিতজনেরা সহযোগিতা করেন। এই মানবিক বন্ধন আমাদের সমাজের শক্তি। কিন্তু এই সহযোগিতাকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করা সম্ভব।

প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে একটি শেষ বিদায়-সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে মরদেহ গোসল ও কাফনের উপকরণ, জানাজা ও দাফনের সমন্বয় এবং অসচ্ছল পরিবারের জন্য আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশেষ করে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে সংশ্লিষ্ট পরিবারটি যদি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে, তাদের জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি বয়স্ক, একাকী ও অসহায় মানুষের মৃত্যুর পর যেন যথাযথ মর্যাদায় তাদের শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়, সে বিষয়েও সামাজিক উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।

এ ধরনের উদ্যোগ কেবল মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতা সহজ করবে না; বরং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও সহমর্মিতার বন্ধনও দৃঢ় করবে।

মৃত্যুর প্রস্তুতি মানে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রস্তুতি

মৃত্যু নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি আমাদের জীবনের হিসাব নিতে শেখায়। আমি কারও অধিকার নষ্ট করছি কি না, আমার কারণে কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না, আমার কোনো ঋণ বা দায়দায়িত্ব অপূর্ণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

আমরা অনেক সময় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করি সামান্য স্বার্থের কারণে। ক্ষমা চাইতে সংকোচ করি, ভুল স্বীকার করতে অহংকারে বাধে, আবার ক্ষমা করার ক্ষেত্রেও সংকীর্ণতা দেখাই। অথচ জীবন যে এত অনিশ্চিত, তা জেনেও আমরা কত কথা না বলে রেখে দিই, কত সম্পর্ক অযত্নে নষ্ট করি, কত মানুষের প্রতি অন্যায় করেও সংশোধনের চেষ্টা করি না!

মৃত্যুর প্রস্তুতি তাই শুধু শেষ সময়ের জন্য কিছু ব্যবস্থা করে রাখার নাম নয়। এটি জীবনের প্রতিটি দিনকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার শিক্ষা। মানুষের হক আদায় করা, পরিবারকে ভালোবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং নিজের ভুল সংশোধন করা—এসবই সেই প্রস্তুতির অংশ।

আমাদের সন্তানদেরও শেখানো দরকার, মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। এ বিষয়ে বয়সোপযোগী ও সংবেদনশীল আলোচনা তাদের জীবনের বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে বয়স্ক ও অসুস্থ স্বজনদের ইচ্ছা, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং তাদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান করাও পরিবারের দায়িত্ব।

শেষ কথা

আমরা কেউ জানি না, জীবনের শেষ দিনটি কবে আসবে। কিন্তু এটুকু জানি, একদিন আমাদের প্রত্যেককেই বিদায় নিতে হবে। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে অস্বস্তি নয়, বরং দায়িত্বশীল আলোচনা হওয়া উচিত পরিবারে, সমাজে এবং ধর্মীয় পরিসরে।

আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজের দায়িত্বগুলো গুছিয়ে রাখা, মানুষের পাওনা পরিশোধ করা, বৈধ উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সদস্যদের অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে সমাজের উচিত ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের শেষ বিদায়কে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা।

জীবনের শেষ অধ্যায় কখন লেখা হবে, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু সেই অধ্যায়ের আগে আমরা কতটা দায়িত্বশীল জীবনযাপন করব, কত মানুষের উপকারে আসব এবং প্রিয়জনদের জন্য কতটা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা রেখে যাব, তা অনেকটাই আমাদের হাতে।

মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু দায়িত্বহীনতা অনিবার্য নয়। বিদায় অবধারিত, কিন্তু প্রিয়জনদের জন্য অগোছালো ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়া অবধারিত নয়।

আসুন, মৃত্যুকে ভয়ের বিষয় না ভেবে জীবনের সত্য হিসেবে গ্রহণ করি। ধর্মীয় বিশ্বাসে নিজেদের সমৃদ্ধ করি, সামাজিক দায়বদ্ধতায় সচেতন হই এবং এমনভাবে বাঁচি, যাতে আমাদের বিদায়ের পরও পরিবার পায় নিরাপত্তা, সমাজ পায় অনুপ্রেরণা, আর মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় আমাদের ভালো কাজের পরিচয়।

কারণ শেষ পর্যন্ত জীবন কত দীর্ঘ ছিল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—জীবন শেষ হওয়ার আগে আমরা কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি।

লেখক: সাবেক সাংবাদিক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)