ভ্রমণ
আসাদুজ্জামান সরদার
শ্রীহট্ট—দুই পাতা এক কুঁড়ির দেশ কিংবা হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি—যে নামেই ডাকি না কেন, সবাই একনামে চেনে সুরমা পাড়ের সিলেটকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা থেকে উত্তর-পূর্বের জেলা সিলেটের দূরত্ব ৪৬০ কিলোমিটার।
পাহাড়-মেঘ, নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, পাথর আর সবুজের মেলবন্ধনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে এবং প্রকৃতির অভিজ্ঞতা নিতে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের উদ্যোগে তরুণ সাংবাদিকদের ১৪ জনের একটি দল সম্প্রতি ঘুরে এলো সিলেট। প্রায় ৯-১০ বছর পূর্বে একবার এখানে আসার সুযোগ হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর এসে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন ও অবহেলার ছাপ দেখে কিছু বিষয়ে হতাশও হতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যে শুধু সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ তা নয়, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা সিলেটেও তার স্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়। এবার সাতক্ষীরায় যখন ভারী বৃষ্টিতে চারপাশ তলিয়ে গেছে, সিলেটে গিয়ে আমরা বৃষ্টির দেখা পর্যন্ত পাইনি।
যাত্রা শুরু
সাতক্ষীরা শহরের সঙ্গীতা মোড় থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মামুন পরিবহনের বাস ছেড়েছিল সিলেটের উদ্দেশে। রাত সাড়ে ৮টায় যশোর শহরের মণিহার সিনেমা হলের সামনে হালকা বিরতি, এরপর গোপালগঞ্জের দাসের হাটে ‘এভারগ্রীন হাইওয়ে ইন’-এ রাতের খাবার শেষ করে বাস ছুটে চলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। রাতের অন্ধকারে পদ্মা সেতু পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের আলো এবং ভোরের আলোয় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন মিনারযুক্ত মসজিদ ও ওভারব্রিজ পার হয়ে আমরা প্রবেশ করি সিলেটে। সিলেটে ঢোকার মুখেই সুরমা নদীর সৌন্দর্য এবং নদীর ওপর নির্মিত লন্ডনের নকশায় সুরমা দক্ষিণ বাসটার্মিনাল নজর কাড়ে সবার।
প্রথমে সিলেট শহরের একটি হোটেল থেকে হালকা নাস্তা সেরে সকাল ৯টায় আমরা রওনা হই লালাখালের উদ্দেশে। লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলধারা, পাহাড় ও আশেপাশের চা বাগানের সবুজ সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। এর আগে একবার লালাখাল গেলেও সন্ধ্যা নামার কারণে আমরা অল্প একটু গিয়ে ফিরে আসি। এবার আমরা লালাখালের বাংলাদেশি শেষ প্রান্তে নেমে পাহাড়ি চা বাগান দেখতে যাবো। কিন্তু আমাদের আগে যাওয়া পর্যটকরা নিষেধ করেন। কারণ সেখানে নাকি অনেক জোঁক আছে। আমরা তাদের নিষেধ অমান্য করি। সাংবাদিক রাহাত রাজার পায়ে জোঁক লাগবে—এমন সময় আমি টের পেয়ে যাই। কিন্তু সফরসঙ্গী বিপ্লব ভাই জোঁকের হাত থেকে নিস্তার পাননি। ছোট ভাই ইব্রাহিম খলিল, হোসেন আলী এবং মিলনসহ বেশ কয়েকজন সহকর্মী চা বাগানের উপর পর্যন্ত উঠেছিল। আমি আর হাবিবুল হাসান ভাই মালতী দেবী নামে একজন পাহাড়ি নারীর বাড়িতে গেলাম, তিনি আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। ওপারে ভারতীয় বিএসএ টহল দিচ্ছে। সেখান থেকে ফেরার পথে দেখা হয় হরি মাস্টার নামে একজনের সাথে। তার হাতে তৈরি চা পান ছাড়াও শুনি স্বরচিত কবিতার আবৃত্তি। তিনি সিলেট সরকারি কলেজ থেকে পাস করে লালাখাল এলাকার একটি স্কুলে পড়াতেন, এখন অবসর নিয়েছেন, চা বিক্রি করেন।
লালাখাল থেকে তপ্ত দুপুরে ফিরে উঠে পড়ি আমাদের রাঙ্গা ভাইয়ের চার চাকার যানে, রওনা হই জাফলং ও ডাউকি সীমান্তের দিকে। জুমার নামাজের বিরতি শেষে আমরা পৌঁছাই গোয়াইনঘাটের বিখ্যাত জাফলং-এ। তবে গোয়াইন নদীতে পানি অনেক কম থাকায় হেঁটেই নদী অতিক্রম করতে হয়। আগেরবারের তুলনায় পাথর নেই বললেই চলে। এটা দেখে রীতিমতো হতাশ হলাম।
খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি ও পাথুরে সৌন্দর্য উপভোগ করেন সাংবাদিকরা। ডাউকি সীমান্তের কাছে স্বচ্ছ পানিতে গোসল করার আনন্দ মিস করিনি।
সন্ধ্যায় আধ্যাত্মিক নগরীর মহান সাধক হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে সেখান থেকে হোটেলে ফিরি। সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বাংলানিউজের বিভাগীয় প্রতিনিধি নাসির উদ্দীন ভাইয়ের আপ্যায়নে মুগ্ধ হই। আমাদের ভ্রমণ সফল হওয়ার ক্ষেত্রে তার অনেক বড় অবদান ছিল। পরে রাতে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যাই এবং জিয়ারত করি। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ঐতিহ্যবাহী জালালি কবুতর, দীঘির গজার মাছ এবং খ্যাতনামা চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রয়াত সালমান শাহর কবর প্রত্যক্ষ করি। রাতের আহার শেষে আমরা ছয় জন দুই রিকশায় বেরিয়ে পড়ি ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি দেখতে।

সাদা পাথর ও রাতারগুল
ভারতের মেঘালয় রাজ্য ও শিলং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ধলাই নদীর তীরে অবস্থিত ভোলাগঞ্জ ‘সাদা পাথর’। ট্রলারে চেপে সাদা পাথরে গিয়ে দেখা গেল এক অপূর্ব দৃশ্য—একপাশে সবুজ পাহাড়, আকাশে মেঘের খেলা, আর নিচে সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কাচের মতো স্বচ্ছ পানির ধারা। পানির তলদেশ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। জাফলংয়ের পানি দেখতে না পাওয়ার দুঃখ দূর হয়। সবাই গোসলে নেমে পড়েন। আমরা সেখানে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা গোসল করি এবং মেঘালয় রাজ্যের শিলং পাহাড়ের সাথে মেঘের মিতালী উপভোগ করতে থাকি।
পরে বিকেলে আমরা যাই দেশের একমাত্র জলজ বন বা সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুলে। তবে রাতারগুল ভ্রমণকালে তীব্র গরম ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রভাব চোখে পড়ে। ছবি বা ভিডিওতে যেমন দেখা যায়, তার কোনো কিছুই চোখে পড়েনি।
শহরে ফেরা
সিলেট শহরে ফেরার পথে আমরা দেশের প্রথম চা বাগান ‘মালনীছড়া’ পরিদর্শনে যাই এবং সিলেটের বিখ্যাত ‘পানসী’ রেস্তোরাঁয় ভূরিভোজ সেরে মামুন পরিবহন কাউন্টারে লাগেজ রেখে আমি, রাহাত রাজা, রেজাউল এবং হোসেন আলী বেরিয়ে পড়ি সিলেট দক্ষিণ সুরমা বাসটার্মিনাল দেখতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাসটার্মিনালটি নজর কেড়ে নিলো। ওই দিনই সন্ধ্যা ৬টায় সাতক্ষীরায় উদ্দেশে রওনা দিয়ে নিরাপদে পৌঁছাই।
লেখক: সুবর্ণভূমির সাতক্ষীরা প্রতিনিধি