গণঅভ্যুত্থান ও সংবাদকর্মী
ইমরান হোসেন রাজ
সংবাদকর্মী হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের আন্দোলনের শুরু থেকেই তাদের কর্মসূচিগুলো নিয়মিত কাভার করতাম। বিশেষ করে সময় টিভির যশোরের ক্যামেরাপার্সন আজাদ ও আমি প্রায় প্রতিদিনই মাঠে থাকতাম। ছাত্রদের সঙ্গে আজাদের যোগাযোগ ছিল। সে যখন আমাকে সিগন্যাল দিতো, আমি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম।
একসময় আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন নাগরিক টিভির ক্যামেরাপার্সন তরিকুল, দৈনিক কল্যাণের অপু। পরে ডিবিসির ক্যামেরাপার্সন রাব্বি আল-আমিন, এখন টিভির ক্যামেরাপার্সন ইমামুলসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিকও আমাদের সঙ্গে থাকতেন।
প্রতিদিনের একটা নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। প্রেসক্লাবের সামনে থেকে ছাত্রদের মিছিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমরা চাঁচড়া চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতাম। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে অবস্থান করতাম। বিকেল ৩টা-৪টার দিকে তারা যখন মিছিল নিয়ে আবার শহরের দিকে ফিরতো, আমরাও তাদের সঙ্গে ফিরতাম। কখনো কখনো চাচড়া চেকপোস্টে যাওয়ার পথ পরিবর্তন হতো, কিন্তু আমাদের মাঠের কাজ চলতেই থাকতো।
আন্দোলন যতই তীব্র হতে লাগলো, আমরা সাংবাদিকরাও তত বেশি মিছিলের সামনের দিকে অবস্থান করে কাজ করতে থাকলাম। তখন অনেক ছাত্র আমাদের চিনতো এবং সাংবাদিক হিসেবে আমাদের ভূমিকা বুঝতো। আবার কিছু ছাত্র আমাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতো না, ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতো কিংবা নানা ধরনের বাজে কথা বলতো। আমরা সেগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না; বরং মুচকি হেসে এড়িয়ে যেতাম। কারণ আমাদের জানা ছিল, গণঅভ্যুত্থানকালে ঢাকাভিত্তিক কিছু টেলিভিশন চ্যানেলের অবস্থান ছিল পুরোপুরি ফ্যাসিস্টের পক্ষে। ফলে ছাত্রদের ক্ষোভ জন্মানোটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা গেছে, যে টেলিভিশন চ্যানেল ফ্যাসিস্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদেরই মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মী ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল, এমনকি কখনও কখনও গণআন্দোলনে সরাসরি যুক্ত।
ছাত্রদের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজনের মধ্যে রাশেদ খানও জানতেন, আমরা সাংবাদিক হিসেবে কেন মাঠে থাকি এবং আমাদের ভূমিকা কী।
সেই সময় আরেকটি বিষয় আমার মনে পড়ে। মাঝে মাঝে সময় টিভির আজাদ কাউকে ফোন করতো, আর ছাত্রদের জন্য পানি, খাবার কিংবা শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো। আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশের মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন কিছু দৃশ্য আমাদের চোখে পড়তো।
৩-৪ আগস্টের ঘটনা
আন্দোলনের একপর্যায়ে ৩ আগস্টের দিকে পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরের পর, সম্ভবত বিকেল ৪টা-৫টার দিকে আওয়ামী লীগের দুটি পক্ষের মিছিল হয়।
এর মধ্যেই খবর আসে বিএনপির পার্টি অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়েই আমরা সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি সত্যিই দলীয় কার্যালয়ে আগুন জ্বলছে।
কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং যশোর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রানা ভাইসহ আরও কয়েকজন। তারা সাংবাদিকদের ঘটনার বিষয়ে ব্রিফিং দেন।
সেদিনের আরও অনেক ঘটনা এখন আর পরিষ্কারভাবে মনে নেই। সময়ের সঙ্গে কিছু কিছু স্মৃতি ঝাঁপসা হয়ে গেছে।
৫ আগস্ট: যে দিনটি আমার কাছে অন্যরকম
৫ আগস্ট ২০২৪।
সেদিন কী ঘটতে যাচ্ছে, আমরা কেউই নিশ্চিতভাবে জানতাম না। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়বেন—এমন কোনো ধারণা নিয়ে আমরা সকাল শুরু করিনি।
সেদিন রাজপথ ছিল মানুষে মানুষে পূর্ণ। উত্তেজনা ছিল টানটান
আমি তখন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা, মাথায় হেলমেট, কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ এবং হাতে ভিডিও ক্যামেরা। আমার সঙ্গে আজাদ, রাব্বি ও অপুসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিকও প্রায় একই ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে ছিলাম।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল। এর মধ্যেই নানা ধরনের খবর ভেসে আসতে শুরু করে যে, হাসিনা পালানোর চেষ্টা করছেন।
বেলা সাড়ে ১১টা বা ১২টার দিকে আমি ও রাব্বি আল-আমিন একসঙ্গে একটি ছবিও তুলেছিলাম। তখনও বুঝিনি, কয়েক ঘণ্টা পর আমার জীবনের অন্যতম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।
দুপুর ২টা বা আড়াইটার দিকে খবর আসে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। চাচড়া চেকপোস্ট এলাকায় ছাত্র-জনতার মধ্যে থাকা কিছু তরুণ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর শুরু করে। পরিস্থিতি দেখে আমরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।
আমরা তখন কয়েকজন সাংবাদিক এক সাথে ছিলাম। একপর্যায়ে আমরা দুই ভাগে ছড়িয়ে পড়ি।
আমি আর সময় টিভির আজাদ একটি নতুন নির্মাণাধীন ভবনের দিকে চলে যাই। পরে আজাদকে একটি তেল পাম্পের ভেতরে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আর আমি থেকে যাই ওই নির্মাণাধীন ভবনের ওপরে।
এরপরই শুরু হয় আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কয়েকটি মুহূর্ত।
আমি ক্যামেরাটি পরীক্ষা করতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। আমার হাত থেকে ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ক্যামেরাটি ভেঙে ফেলা হয়।
তারপর কয়েকজন আমাকে টানাহেঁচড়া করতে থাকে। আমার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট ও ক্যামেরার ব্যাগও কেড়ে নেওয়া হয়।
সেই সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটটি গায়ে থাকায় আঘাতের কিছুটা ধাক্কা হয়তো কম লেগেছিল। কিন্তু এরপরও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছিলাম।
আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না—কীভাবে এখান থেকে বের হবো।
গণপিটুনির সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
সেদিন প্রথমবার খুব কাছ থেকে বুঝেছিলাম, ‘গণপিটুনি’ বলতে কী বোঝায়।
তবে সেই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু মানুষ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। আন্দোলনেরই কয়েকজন ভাই আমাকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করেন। তারা আমাকে একটি ইজিবাইকে তুলে দেন। সেই ইজিবাইকে করেই আমি প্রেসক্লাবে ফিরে আসি।
আজও তাদের কয়েকজনের মুখ মনে করতে পারি না। তবে তাদের মধ্যে একজনকে আমি চিনি—আমার ছোটভাই/বন্ধু, অ্যাডভোকেটের সহকারী সবুজ।
যারা সেদিন আমাকে উদ্ধার করেছিলেন, তাদের সবাইকে আমি আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।
আপনাদের মধ্যে কেউ যদি এই লেখা পড়েন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আপনাদের সঙ্গে একবার কুশলবিনিময় করতে চাই। সেদিন আপনারা যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, সেটা আমি কোনোদিন ভুলব না।
আনন্দের দিন, অথচ আমার কাছে আতঙ্কের দিন
৫ আগস্ট ২০২৪—অনেকের কাছে দিনটি আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিজয়ের স্মৃতি হয়ে আছে। কিন্তু আমার কাছে দিনটি অন্যরকম। সেদিন হয়তো সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার ৫ আগস্ট কেটেছে ভয়, আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে।
আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন আমি বেঁচে ফিরেছি। মনে হয়েছে, আল্লাহ নিজ হাতে আমাকে রক্ষা করেছেন।
সেদিনের ঘটনার পর প্রায় দেড় মাস আমার পুরো শরীরে ব্যথা ছিল। বাড়ির সামনে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছি এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়েছি।
শরীরের ব্যথা একসময় কমে গেছে। কিন্তু কিছু স্মৃতি শরীরের ব্যথার মতো সহজে যায় না।
কিছু স্মৃতি বিস্মৃত
আজ এতদিন পরও সেই দিনটির কথা মনে হলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।
ইতিহাসের বড় কোনো ঘটনা শুধু সংবাদপত্রের শিরোনাম, টেলিভিশনের ফুটেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে বোঝা যায় না। সেই সময়ের ভেতরে থাকা মানুষের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা গল্প থাকে। ৫ আগস্টের আমার গল্পটাও তেমনই।
লেখক: মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার, সুবর্ণভূমি