সম্পাদকীয়
পশ্চিমবাংলা, যে রাজ্যটি দীর্ঘকাল ধরে ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল উদ্বেগজনক এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। এক সময় যে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ শান্তিতে বসবাস করতেন, যেখানে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কখনো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি, সেই রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতালাভের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
নির্বাচনোত্তর সহিংসতা যে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার চেয়ে বেশি কিছু, তা স্পষ্ট হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ধরণ দেখে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তত ৩৪টি সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে- এটি কোনো আনুষঙ্গিক ঘটনা নয়, বরং সংগঠিত উগ্রবাদেরই ইঙ্গিত। মসজিদে হামলা, মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যু, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতা, বারাসাতের মতো নগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই হানাযজ্ঞ শঙ্কারই জন্ম দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের বুলডোজার সংস্কৃতি এখন পশ্চিমবাংলা ত্রাস ছড়াতে মিছিলে ব্যবহার হচ্ছে- এটি অত্যন্ত ভয়াবহ লক্ষণ। যে রাজ্যে বিনা রক্তপাতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব, সেখানে বুলডোজার রাজনীতির আগমন মানে শান্তির সেই সংস্কৃতির চরম অবক্ষয়।
প্রশ্ন উঠছে, যে বিজেপি ‘সব জনতার সরকার’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছে, তার কর্মী-সমর্থকরা কেন সংখ্যালঘুদের ওপর এতো ঘৃণা উগরে দিচ্ছে? শাসক দল হিসেবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব বিজেপির ওপরই বর্তায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সহিংসতা যেন কোনো অদৃশ্য অনুমোদনেই ঘটছে বলে মনে হয়।
পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্য ধ্বংস হতে দিলে তা গোটা দেশের জন্যই মারাত্মক বার্তা হবে। ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের যে আদর্শ, পশ্চিমবঙ্গ তার অন্যতম দুর্গ ছিল। সেই দুর্গ যখন ভাঙতে বসেছে, নীরব থাকার সময় নেই। সকল শান্তিপ্রিয় নাগরিকের এখন এই উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত।
শুধু রাজনৈতিক দল নয়, প্রতিটি নাগরিককে এখন বুঝতে হবে যে সাম্প্রদায়িকতা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যই বিপজ্জনক নয়, এটি গোটা সমাজের স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যই হুমকিস্বরূপ।