সম্পাদকীয়
নড়াইলের লোহাগড়ার পল্লীতে গত রোববার ভোররাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের সমাজের জটিল এক বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে রয়েছে নৈতিকতার প্রশ্ন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনের শাসন। দুটোরই সঠিক সমন্বয় না ঘটলে সামাজিক বিচারযাত্রা বিপথগামী হয়।
ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিবেশী এক ব্যক্তি ওই দিন ভোরে এক নারীর ঘরে ঢোকেন। ওই নারীর স্বামী বিদেশে থাকেন। গৃহবধূর সাথে ভিন্ন এক পুরুষের সম্পর্ক অনৈতিক কি না, সে বিচার সমাজ করতে পারে, নিন্দা করতে পারে। কিন্তু স্থানীয় লোকেরা ওই নারী ও পুরুষকে শেকলে বেঁধে বাইরে এনেছেন, কেউ কেউ নারীর চুল কেটে দিতে উদ্যত হয়েছেন। এই কাজ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়ার একমাত্র কর্তৃত্ব বিচার বিভাগের। আদালতের রায় ছাড়া কাউকে শেকলে বাঁধা, নির্যাতন করা, চুল কাটা বা প্রকাশ্যে অপমান করা যায় না। ঘটনার সময় ওই নারী বলেছেন, ‘অনৈতিক কিছু ঘটে থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক’। এটা একেবারে ন্যায়সঙ্গত কথা। সমাজের উচিত ছিল বিষয়টি থানায় জানানো, প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া, আইনকে কাজ করতে দেওয়া। জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়া সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না।
বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবাসী শ্রমিক। অর্থনৈতিক কারণে স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ বিচ্ছেদ এক অনিবার্য বাস্তবতা। তাদের মানবিক ও জৈবিক চাহিদা অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত না। আমাদের সমাজ বহুগামী নয়। বরং বহুগামিতাকে নিন্দা করে এই সমাজ। কিন্তু যে নারীর স্বামী দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন, তার ব্যক্তিগত জৈবিক চাহিদা কীভাবে মিটবে, তা কি কেউ চিন্তা করেন? চিন্তা করলেও তার কাছে কি এর কোনো সমাধান আছে? ফলে সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় এই প্রশ্নে। একদিকে ব্যক্তিজীবনের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ না করার নীতি, অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়ের ঘোর বিরোধিতা করা। আমরা কোনো পক্ষকেই উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করছি না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। একথা সবাইকে মানতে হবে।
আবহমান কাল ধরে বাংলার সমাজ নীতি-নৈতিকতা চর্চা করে আসছে; যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। সেই নীতি-নৈতিকতার উদ্ভব এমন সময়ে যখন কোনো স্বামীকে বিদেশে দীর্ঘসময় অবস্থান করতে হয়নি। তাহলে সেই নৈতিকতা আজকের বাস্তবতার সাথে কতটুকু যায়, তাও দেখার দরকার আছে। তার অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের সমাজে কোনো কোনো নারীর জৈবিক চাহিদা পূরণের অবাধ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লোহাগড়ার এই ঘটনার মতো অনেক ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। কোনোটি প্রকাশ্যে আসে, কোনোটি আসে না। ফলে এটা এক জটিল সামাজিক অবস্থা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথও সহজ নয়।
এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা সমাজের মানুষকে এইটুকু পরামর্শ দিতে পারি যে, আইন নিজের হাতে তোলার প্রবণতা বন্ধ করুন। যেকোনো বিষয় অনৈতিক মনে হলে তা বিচারের ভার প্রচলিত আইন-আদালতের ওপরই অর্পণ করা শ্রেয়। অনৈতিকতার শাস্তি আইনে আছে, জনতার চুলকাটা লাঠিয়ালিতে নয়। একবিংশ শতকে এসে এটা আমাদের বোঝা উচিত।