ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ এবছর শেষ হবে
বেনজীন খান
বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, ভূগোল, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির বিচারে ভারত বৃহৎ প্রতিবেশী। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু শক্তির প্রশ্ন নয়; কৌশল, ধারাবাহিকতা, তথ্য, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘আমরা কিছুই করতে পারি না’- বাস্তবতা পুরোপুরি তা নয়।
বাংলাদেশের করণীয় কয়েকটি স্তরে ভাবা যায়:
১. আবেগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশল:
ফারাক্কা ইস্যুকে কেবল ‘ভারতবিরোধিতা’ বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ করলে লাভ কম। কারণ নদী প্রশ্নটি দশকব্যাপী কূটনৈতিক বিষয়।
বাংলাদেশের দরকার সব সরকারের মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য, ধারাবাহিক নদীনীতি, বিশেষজ্ঞভিত্তিক কূটনীতি।
ভারত বড় রাষ্ট্র হলেও ধারাবাহিক ও তথ্যসমৃদ্ধ অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রভাব তৈরি করে।
২. তথ্য ও গবেষণাকে শক্তি বানানো:
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘অভিযোগ’ নয়, ‘প্রমাণ’ বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশকে নিয়মিতভাবে তুলে ধরতে হবে-
* শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমার ডেটা
* লবণাক্ততা বৃদ্ধির মানচিত্র
* কৃষি ক্ষতির পরিসংখ্যান
* নদী নাব্য সংকট
* পরিবেশগত বিপর্যয়
* জলবায়ু ঝুঁকি।
যত বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকবে, তত বেশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।
৩. আন্তর্জাতিকীকরণ মানে যুদ্ধ নয়:
অনেকে মনে করেন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয় তোলা মানেই ভারতবিরোধী অবস্থান। বাস্তবে তা নয়।
বাংলাদেশ করতে পারে: জাতিসংঘের পানি কূটনীতি, আন্তর্জাতিক নদী সম্মেলন, জলবায়ু ন্যায়বিচার সংক্রান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, দক্ষিণ এশীয় পরিবেশ সহযোগিতা।
কারণ এখন পানি প্রশ্নটি শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়; জলবায়ু ও পরিবেশ নিরাপত্তার বিষয়ও।
৪. আঞ্চলিক জোট ও বহুপাক্ষিকতা:
বাংলাদেশ একা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ আন্তঃসীমান্ত নদী সমস্যার মুখোমুখি।
সম্ভাব্য ক্ষেত্র-
নেপালের জলাধার সহযোগিতা, ভুটানের জলবিদ্যুৎ, ইওগঝঞঊঈ বা ইইওঘ কাঠামো। অর্থাৎ, বঙ্গোপসাগরীয় বহুখাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ বা বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগ। এক কথায় বঙ্গোপসাগরীয় পরিবেশ সহযোগিতা।
কারণ যত বেশি বহুপাক্ষিক কাঠামো তৈরি হবে, একতরফা সিদ্ধান্ত তত কঠিন হবে।
৫. দেশের ভেতরের দুর্বলতা কমানো:
ফারাক্কা বড় কারণ, কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা আছে।
যেমন-
নদী দখল, দূষণ, খাল ভরাট, জলাভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত বাঁধ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অভাব।
শুধু উজানের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
৬. অর্থনীতি ও কূটনীতির সম্পর্ক বোঝা:
যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, তার কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতাও তত বেশি।
বাংলাদেশ যদি বন্দর, ট্রানজিট, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি- এসব ক্ষেত্রে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে পারে, তাহলে নদী প্রশ্নেও তার কণ্ঠস্বর ভারি হবে।
৭. জনগণকে তথ্যভিত্তিক সচেতন করা:
ফারাক্কা প্রশ্নে দুই ধরনের বিপদ আছে। যেমন, অতিরিক্ত আবেগ, অথবা সম্পূর্ণ উদাসীনতা।
দরকার বাস্তবভিত্তিক জনআলোচনা:
নদী মানে শুধু পানি নয়। নদী মানে খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, অভিবাসন, উপকূলীয় জীবন, অর্থনীতি প্রভৃতি।
ছোট রাষ্ট্রের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সময় সামরিক শক্তি নয়, বরং কৌশলগত ধৈর্য, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর প্রভাব তৈরি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নদী প্রশ্নে সম্ভবত সেটিই সবচেয়ে বাস্তব পথ।
আবারো বলি, বাংলাদেশের ভাবনা শুধু ‘পানি ভাগ’ নয়, প্রয়োজন পুরো ‘গঙ্গা অববাহিকার যৌথ ব্যবস্থাপনা’র দাবি করা।
আশা করবো, আগামী চুক্তি আরও বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য আমরা বিস্তর প্রস্তুতি নিয়েছি অথবা নিচ্ছি।
১৭/০৫/২০২৬
লেখক: সংগঠক, অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক