শরিফ খান
, যশোর
চলতি বোরো মৌসুমে মাঠে সোনালি ধান ফলিয়েও মুখে হাসি নেই যশোরের কৃষকদের। বাম্পার ফলন হলেও ধান কেটে ঘরে তুলতে গিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
ধানের দাম আর শ্রমিকের দৈনিক মজুরি কাছাকাছি হওয়ায় বিপাকে পড়েছে কৃষক। ফলে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে এবার মোটা অঙ্কের লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটছে এ অঞ্চলের চাষিদের।
স্থানীয় বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে গড়ে এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ১৫০ টাকায়। অথচ, তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে একজন ধানকাটা শ্রমিকের দৈনিক মজুরিই ঠেকেছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। অর্থাৎ, এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের এক বেলার মজুরি মেটানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
যশোর সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুস সামাদ জানিয়েছেন, মাঠের ধান কেটে, মাড়াই করে হাটে নিয়ে বিক্রি করা পর্যন্ত পদে পদে খরচ। শুধু ধান কাটার মজুরিই নয়, এর সাথে যোগ হয়েছে পরিবহন, সার, সেচ, বীজ এবং মাড়াইয়ের বাড়তি খরচ। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় এতোটাই বেড়েছে যে, এবার লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
একই গ্রামের আর এক কৃষক রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘এক বিঘা ধান কাটতে চারটা জোন লাগে, ওখানে দিতে হচ্ছে চার হাজার টাকা। আঁটি বাঁধতে দুইটা জোন লাগে, তাদের দিতে হয় দুই হাজার টাকা। ধান ঝাড়তে লাগে দুইটা জোন, সেখানে যাচ্ছে আবার দুই হাজার টাকা। সবমিলিয়ে আট হাজার টাকা। শুধু ধান পাকার পরে তা কেটে ঘরে আনা পর্যন্ত প্রতি বিঘায় শ্রমিকের এই পরিমাণ বিল দিতে হয়।’
‘এর আগে সার, পানি, তেল যা আছে তা তো হিসেব করলে সব মিলিয়ে এক বিঘা ধান ঘরে উঠাতে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এক বিঘা জমিতে ধান হচ্ছে ২০ থেকে ২২ মণ, সেই হিসেব করলে আমাদের গৃহস্থদের কিছুই থাকে না। আগামী বছর থেকে ধান করবো কি না সন্দেহ,’ বলেন রেজা কিবরিয়া।
এদিকে, রয়ড়াপুরের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘গত বছর আমি ধান করেছিলাম চার বিঘা এ বছর করেছি মাত্র এক বিঘা। ধান করে লাভ হচ্ছে না, উল্টো পকেটের টাকা দিয়ে শ্রমিকর বিল মেটাতে হয়। এজন্য শুধুমাত্র নিজেদের খাওয়ার ধান চাষ করেছি।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, যশোর জেলায় চলতি বছর চালের বার্ষিক চাহিদা চার লাখ ৬৭ হাজার ৮১ মেট্রিক টন। বিপরীতে এবার বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সাত লাখ ১৭ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। যা চাহিদার তুলনায় দুই লাখ ৫০ হাজার ৮০৯ মেট্রিক টন বেশি। চলতি মৌসুমে জেলার মোট এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।
এ সংকট উত্তরণে কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে কম্বাইন্ড হারভেস্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কৃষকদের খরচ ও সময় দুটোই বাঁচবে।