সম্পাদকীয়
জলবায়ু পরিবর্তন মানবসৃষ্ট সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট। আর এই সংকটের সবচেয়ে অগ্রবর্তী অংশে থাকা দেশটির একটি হলো বাংলাদেশ। মজার ব্যাপার হলো, এই বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি আমরা অথচ ক্ষতির প্রভাবে আমরা আছি সবার শীর্ষে। বৈশ্বিক উষ্ণতা শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি এখন নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক দুর্ভোগের প্রতিশব্দ।
সুবর্ণভূমির ২১ মের সরেজমিন প্রতিবেদনটি শুধু একখণ্ড সংবাদ নয়; এটি উপকূলের লাখো মানুষের করুণ কাহিনির দলিল। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট- যে জেলাগুলো একসময় সবুজ ফসলে শস্যশ্যামল ছিল, সেখানে এখন শুধু নোনা পানির দাপট। ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানের মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সেখানে লবণাক্ততা গ্রাস করেছে চাষের জমি। যেখানে একসময় ধান হতো, সেখানে এখন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে নোনা পানির চিংড়ির ঘের। সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষ জমি হারিয়ে হয়েছেন দিনমজুর, অথবা ঘেরে খেটে কোনোমতে বাঁচছেন।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে মর্মন্তুদ চিত্র ফুটে উঠেছে নারীদের জীবনসংগ্রামে। সংবাদ প্রতিবেদনে যেমন উঠে এসেছে, নারীরা দিনের পর দিন নোনা পানিতে চিংড়ির রেণুপোনা সংগ্রহ করেন। তাদের হাত-পা, ত্বক, চোখ-কান সবকিছুই নানা রোগে আক্রান্ত। আয় এতো কম যে অর্জিত অর্থের বড় অংশ চলে যায় ওষুধ কিনতে। বিষাদময় ব্যাপার হচ্ছে, এই পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা নিজেদেরই ধ্বংসের পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করছেন।
এটা আর শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতার গল্প নয়; এটি সাম্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। যেসব শিল্পোন্নত দেশ অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করে জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তাদের দেওয়া ক্ষতিপূরণের তহবিল এখনো বাস্তবের মাটিতে নামেনি। বাংলাদেশ তার সীমিত সম্পদ দিয়েই উপকূল বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রয়োজন স্বাদু পানির ব্যবস্থা, প্রয়োজন লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের গবেষণা ও প্রসার, প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিশেষত নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। উপকূলীয় জনপদকে বাঁচাতে হলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল সুষ্ঠু বণ্টন করতে হবে এবং ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ যেমন সোচ্চার, তেমনি তার নাগরিকদের টিকে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সাতক্ষীরার নারীদের চোখের জলে ভাসা সেই নোনাপানি যেন আমাদের বিবেককে নাড়া না দিয়ে না যায়। বিলম্ব না করে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া হোক।