সম্পাদকীয়
দীর্ঘ এক যুগ পর অবশেষে আশায় বুক বাঁধছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ীরা। যশোরের রাজারহাট, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বড় পশুর চামড়ার মোকাম, সেখানকার ব্যবসায়ীরা আশায় রয়েছেন এবার হয়তো পশুর চামড়ার ন্যায্য মূল্য মিলেবে। গত এক যুগ ধরে ধারাবাহিক লোকসানের পর এবার ঈদুল আজহার বাজারে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরবে বলে আশা তাদের। কিন্তু এই আশা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের ওপর।
মওসুমি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রধান সমস্যা পুঁজির সংকট। মওসুমি এই ব্যবসায় মোটা অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। সরকার ব্যাংকগুলোকে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে এর সুফল পান না প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণের সুবিধা পেলেও ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাধ্য হন এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে। এই বৈষম্য দূর না করা গেলে প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হবে না।
গত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বড় ব্যবসায়ীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সিন্ডিকেট গড়ে চামড়ার দাম কৃত্রিমভাবে নামিয়ে আনেন। এই সব বড় ব্যবসায়ী ছিলেন সরকারের অলিগার্ক। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা করা হয়, তিনি স্বয়ং একজন ট্যানারি মালিক। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। নির্দলীয় সরকারের সময়ও বঞ্চিত হয়েছেন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মওসুমি ব্যবসায়ীরা।
চামড়ার বাজারের ধস সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। কারণ কুরবানির চামড়ার বড় অংশ ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কওমি মাদরাসায় দান করেন, যেখানে বিত্তহীন পরিবারের সন্তানরা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। ফ্যাসিবাদী সরকার এই ঐতিহ্যবাহী মাদরাসাগুলোকে ধ্বংস করতে নানা অপকৌশল করেছিল। বর্তমানে সে সরকার নেই। এখন মাদরাসাগুলোর আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির শাসনামলে আগামী ২৮ তারিখ প্রথম ঈদুল আজহা। রাজারহাটের ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এবার পশুর চামড়ার বাজার আগের চেয়ে ভালো হবে বলে । এই আশা যেন বৃথা না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে সরকারকে। প্রয়োজন ব্যাংকঋণের সুযোগ সম্প্রসারণ, সিন্ডিকেট ভাঙা, এবং চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে কওমি মাদরাসাগুলোকে চামড়া দানের সুফল নিশ্চিত করাও জরুরি।
মন্দা কাটিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সেটা শুধু তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়, এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন। সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।