যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২০ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নদী ও পানি প্রশ্নে দুনিয়ার চুক্তিসমূহ

যেভাবে দাঁড়াতে হবে ভারতের মুখোমুখি

বেনজীন খান

প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে,২০২৬, ১১:০০ এ এম
যেভাবে দাঁড়াতে হবে ভারতের মুখোমুখি

সম্ভবত ২০১০-এ কি তার আগে-পরে ১৬ মে ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে যশোরে মুনসী মেহেরউল্লা ময়দানে আমার একটি একক জনসভা হয়। জনসভার শিরোনাম ছিল ‘ভারতের পানি ডাকাতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন’। এ বিষয়ে তখন একটি লিফলেটও প্রচার করা হয়েছিল। সেইসময় যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম অ্যাডভোকেট শরীফ আব্দুর রাকিব আমাকে বলেছিলেন, ‘‘ডাকাতি’ শব্দটা কি বেশি হার্ড হয়ে গেল না?” তিনি আমাকে শব্দটি উঠিয়ে নিতে বলেছিলেন। আমি মরহুমের প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম। দেখলাম, প্রকাশ্য দিবালোকে দুনিয়ার মানুষের সামনে দুর্বলের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়াকে ডাকাতিই বলে!

পৃথিবীতে আন্তঃসীমান্ত নদী ও পানিবণ্টন নিয়ে বহু দেশের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২৬০টির বেশি নদী একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। তাই পানি ব্যবস্থাপনা, বণ্টন, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য নানা ধরনের নদী চুক্তি হয়েছে।

এই চুক্তির বরখেলাপে বিভিন্ন দেশের মধ্যে নানা মাত্রার দ্বন্দ্বও ক্রিয়াশীল রয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ‘গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি’ ও তার বরখেলাপ জলজ্যান্ত উদাহরণ। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকাল থেকে।

দুনিয়ার দেশে দেশে এই পানি চুরি ও ডাকাতির ইতিহাস কম নয়। এখন যেগুলো দ্বন্দ্ব আকারে রয়েছে ভবিষ্যতে তা যুদ্ধে রূপ নেবে, নিশ্চিত বলা যায়। পৃথিবীর বহু দেশে বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র থেকে উৎপন্ন যে সকল নদী দুর্বল রাষ্ট্রের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যথারীতি তারা উজানে বাঁধ দিয়েছে। কিন্তু ভারতের মতো শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের সাথে যে আচরণ করে চলেছে পৃথিবীতে তার নজির বিরল। আবার শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুর্বল রাষ্ট্র তার কূটনীতি ও নানামাত্রিক প্রচেষ্টা দিয়ে প্রতিরোধ করে ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পেরেছে- তারও উদাহরণ একেবারে কম নয়, যেটা বাংলাদেশ পারেনি।

আমরা এক নজর মোটা দাগে দেখে নিতে পারি-

পানি নিয়ে পৃথিবীর কোন কোন দেশের মধ্যে কোন কোন নদীকে নিয়ে চুক্তি আছে? এবং সেখানে বড় দেশ বা শক্তিশালী দেশ ছোট বা দুর্বল দেশের সাথে কেমন আচরণ করেছে, যা ভারত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লাগাতার করে চলেছে!

পৃথিবীতে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে বহু দেশের মধ্যে পানিবণ্টন, নৌপরিবহন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ বা পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে নানা চুক্তি হয়েছে। তবে সব চুক্তি সমান ন্যায্য নয়। কোথাও বড় বা শক্তিশালী রাষ্ট্র সহযোগিতামূলক আচরণ করেছে, আবার কোথাও তারা ছোট বা দুর্বল প্রতিবেশীর স্বার্থ উপেক্ষা করেছে।
ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গা/তিস্তা ইস্যু সেই বৃহত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।

নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
১. নীল নদ (Nile River).
সংশ্লিষ্ট দেশ:
মিশর, সুদান, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া প্রভৃতি।

চুক্তি: ব্রিটিশ আমলে ১৯২৯ সালে Nile Waters Agreement. এবং ১৯৫৯ Egypt–Sudan Agreement.

সমস্যা:
যুগ যুগ ধরে মিশর নীল নদের ওপর তাদের ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ দাবি করে অধিকাংশ পানি ভোগ করতো। আর উজানে থাকা ইথিওপিয়া দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল।

মিশর সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন পানি নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রাখে। অতঃপর বঞ্চিত ইথিওপিয়া যখন তাদের ব্লু নাইল (নীল নদের উপনদী) নদীর উপর একটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ বাঁধ GERD (Grand Ethiopian Renaissance Dam বা ইথিওপিয়ার মহানবজাগরণ বাঁধ) নির্মাণ শুরু করে, তখন মিশর কঠোর চাপ ও হুমকি দেয়। কিন্তু ইথিওপিয়া সকল হুমকি ধামকি মোকাবেলা করেই তাদের কাজ সম্পন্ন করে।

বর্তমানে বাস্তবতা হলো GERD বাঁধ নীল নদের ভূরাজনীতি পুরো বদলে দিয়েছে, এবং এখন বহুপাক্ষিক, ন্যায্য ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জোরালো হয়েছে।

শিক্ষা:
উজানের শক্তিশালী রাষ্ট্র যেমন প্রভাব খাটাতে পারে, তেমনি ভাটির শক্তিশালী রাষ্ট্রও ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ দেখিয়ে আধিপত্য করতে পারে।

২. দজলি ও ফোরাত (টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস) নদী

সংশ্লিষ্ট দেশ:
তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক।

সমস্যা: নদীর উৎস দেশ তুরস্ক। তুরস্ক GAP Project (Southeastern Anatolia Project বা দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া প্রকল্প)-এর মাধ্যমে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে। তারা বহুকাল ধরে নদীকে ‘সীমান্ত অতিক্রমকারী পানি’ হিসেবে দেখে, আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে নয়।

সিরিয়া ও ইরাকের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে তুরস্ক পানি আটকে কৃষি ও জীবনব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তুরস্ক যেহেতু সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। বিশেষত ন্যাটো সদস্য, আঞ্চলিক সামরিক শক্তি, সে কারণে দুর্বল রাষ্ট্র সিরিয়া ও ইরাক তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

সিরিয়া ও ইরাকের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা:

দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইএস সংঘাত ইত্যাদির কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পানি কূটনীতি গড়ে তুলতে পারেনি।

শক্তিশালী রাষ্ট্র এভাবে নিজের স্বার্থে অপরাপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নানামাত্রিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে তাকে দুর্বল করে রাখে। এখানে উজানের শক্তিশালী রাষ্ট্র তুরস্ক অনেকটা ভারতের মতো আচরণ করে। নিজস্ব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভাটির দেশের উদ্বেগ উপেক্ষা করে।

৩. মেকং নদী
সংশ্লিষ্ট দেশ: চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম।

চুক্তি:
১৯৯৫ Mekong River Commission (MRC).

সমস্যা:
চীন গজঈ-এর পূর্ণ সদস্য নয়, কিন্তু উজানে বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছে। চীনের বাঁধের কারণে ভাটির দেশগুলোতে মাছ, কৃষি ও নদীর প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমতাবস্থায় ভাটির দেশগুলো শুধু অভিযোগ করে বসে থাকেনি। তারা গ্রহণ করেছে কার্যকর পদক্ষেপ।

১৯৯৫ সালে তারা সই করেছে Mekong River Commission (MRC) Agreement-এ। এটা মূলত মেকং অববাহিকার নিম্নাঞ্চলীয় চারটি রাষ্ট্র- লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য করা হয়। চীন ও মিয়ানমার এতে পূর্ণ সদস্য নয়; তারা কেবল ‘dialogue partner’ হিসেবে যুক্ত। ফলে নদীর উজানের প্রধান নিয়ন্ত্রক চীন কার্যত চুক্তির বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকে। এই কারণেই দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য চুক্তিটির কার্যকারিতা নির্বিঘ্ন নয়।
তবুও এই MRC দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক ধরনের রক্ষাকবচ হয়েছে। যেমন:

১. আলোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর ফলে MRC ছোট ও তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে একসাথে বসে পানিবণ্টন, বাঁধ নির্মাণ, পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ দেয়। বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মাধ্যমে নিজেদের উদ্বেগ আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে পারে।

২. তথ্য ও ডেটা শেয়ারিং

চুক্তির ফলে নদীর প্রবাহ, বন্যা, খরা ও পরিবেশগত তথ্য আদান-প্রদান কিছুটা নিয়মতান্ত্রিক হয়েছে। এতে কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়েছে।

৩. পরিবেশগত উদ্বেগ আন্তর্জাতিকীকরণ

ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া বা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপের সংকট- এসব বিষয় MRC-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে।

৪. সীমিত হলেও ‘Prior Consultation’ ব্যবস্থা

কোনো বড় বাঁধ প্রকল্প নেওয়ার আগে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। যদিও এটি বাধ্যতামূলক ভেটো নয়, তবু অন্তত আপত্তি জানানোর একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের ভাবনা হওয়া উচিত শুধু ‘পানি ভাগ’ নয়, প্রয়োজন ‘নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা’।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হওয়া উচিত কেবল ফারাক্কায় কত কিউসেক পানি পেল তা নয়; বরং পুরো গঙ্গা অববাহিকার যৌথ ব্যবস্থাপনা দাবি করা।

৪. সিন্ধু নদ চুক্তি (Indus Waters Treaty)

সংশ্লিষ্ট দেশ:

ভারত ও পাকিস্তান।

চুক্তি:

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়।

বৈশিষ্ট্য: এটি বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই পানি চুক্তিগুলোর একটি বলে ধরা হয়।

ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ করলেও চুক্তি পুরোপুরি বাতিল হয়নি। তবে ভারত মাঝে মাঝে ‘পানি বন্ধ’ করার রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে।

শিক্ষা:

শত্রু রাষ্ট্রের মধ্যেও আন্তর্জাতিক গ্যারান্টিযুক্ত কাঠামো থাকলে পানি ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক স্থিতিশীল হতে পারে।

৫. কলোরাডো নদী

সংশ্লিষ্ট দেশ:

যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো।

চুক্তি:

1944 Water Treaty

সমস্যা: যুক্তরাষ্ট্র উজানে বিপুল পানি ব্যবহার করে। ফলে নদী অনেক সময় মেক্সিকো পৌঁছানোর আগেই শুকিয়ে যায়।

দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য বজায় ছিল। পরে পরিবেশ ও ন্যায্যতার প্রশ্নে কিছু সমন্বয় আনা হয়।

শিক্ষা:

শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রথমে একতরফা সুবিধা নিলেও বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক সফলতা দিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতা করতে বাধ্য করা যেতে পারে।

৬. দানিউব নদী

সংশ্লিষ্ট দেশ:

ইউরোপের দশটির বেশি দেশ

বৈশিষ্ট্য:

এখানে সহযোগিতামূলক কাঠামো তুলনামূলক শক্তিশালী। তথ্যবিনিময়, যৌথ কমিশন, পরিবেশ সুরক্ষা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।

শিক্ষা:

আঞ্চলিক আস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকলে পানি সংঘাত কমানো সম্ভব।

৭. মহাকালী চুক্তি (Mahakali Treaty)

সংশ্লিষ্ট দেশ:

ভারত ও নেপাল

চুক্তি:

১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘Mahakali Treaty’ স্বাক্ষরিত হয়।

বৈশিষ্ট্য:

ভারতে শারদা নদী নামে পরিচিত মহাকালী নদী ভারত ও নেপালের সীমান্ত নদী। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত পানি ও জলবিদ্যুৎ চুক্তি।
এই চুক্তি তিনটি প্রকল্পকে এক কাঠামোর অধীনে আনে।

০১. শারদা ব্যারেজ (Sharada Barrage)

০২. তানকপুর ব্যারেজ (Tanakpur Barrage)

০৩. পঞ্চেশ্বর বহুমুখী প্রকল্প (Pancheshwar Multipurpose Project)

উদ্দেশ্য:

পানিবণ্টন, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন।

বিরোধের কারণ ছিল- তানকপুর ব্যারেজ বিতর্ক।

১৯৮০-৯০-এর দশকে ভারত মহাকালী নদীর ওপর তানকপুর ব্যারেজ নির্মাণ করে।

সমস্যা হলো, ব্যারেজের একটি অংশ নেপালের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নির্মিত হয়। নেপালের অভিযোগ ছিল, ভারত যথাযথ সমঝোতা ছাড়াই কাজ এগিয়ে নিয়েছে।
ফলে নেপালের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

এটি অনেকটা বাংলাদেশে ফারাক্কা নিয়ে যে একতরফা সিদ্ধান্তের অভিযোগ আছে, তার সাথে তুলনা করা যায়।

মহাকালী চুক্তি সফলতার মূলে কতগুলো ধারা:

১. মহাকালীকে ‘সীমান্ত নদী’ হিসেবে স্বীকৃতি ও দুই দেশ নদীর পানিতে সমান অধিকার নীতিগতভাবে স্বীকার করে।

২. পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে নেপাল নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাবে।

৩. বিদ্যুৎ বণ্টনেও পঞ্চেশ্বর প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দুই দেশ ভাগ করে নেবে।

৪. নদী উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করে।

এই চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে উভয় দেশের বোদ্ধা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক মতপার্থক্য আছে। আছে বিরোধ। আছে অসন্তোষ। তবুও তা একটা সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়।

ভারত-বাংলাদেশ প্রসঙ্গ:

প্রধান নদী: গঙ্গা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ফেনী, মনু, কুশিয়ারা ইত্যাদি।

ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভিযোগসমূহ

১. একতরফা অবকাঠামো নির্মাণ

ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ, বিভিন্ন বাঁধ ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে বাংলাদেশের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

২. শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট। বিশেষত গঙ্গা ও তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে কৃষি, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৩. অসম ক্ষমতার সম্পর্ক

ভারত আঞ্চলিক পরাশক্তি; বাংলাদেশ তুলনামূলক দুর্বল। ফলে আলোচনায় ক্ষমতার ভারসাম্য সমান নয়।

৪. তিস্তা চুক্তির অনিশ্চয়তা

দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও এখনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আছে। সব দোষ কেবল ‘বড় রাষ্ট্র’ বনাম ‘ছোট রাষ্ট্র’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, প্রাদেশিক সরকার, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তন, জনসংখ্যা ও কৃষির চাপও ভূমিকা রাখে। ভারতের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিও তিস্তা চুক্তিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক কানুনকে মান্যতা দিতে ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে।

আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি

বর্তমানে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ:

০১. ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার।

০২. অন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা।

০৩. বড় প্রকল্পের আগে প্রতিবেশীকে অবহিত করা।

০৪. তথ্য বিনিময় ও যৌথ ব্যবস্থাপনা।

উপসংহার

পৃথিবীর বহু নদী-সংঘাতে দেখা যায়, উজানের শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রায়ই বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ভাটির ছোট রাষ্ট্র নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একতরফা আধিপত্য টেকসই হয় না।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। তবে মিশর-সুদান চুক্তি, মহাকালী চুক্তি, দানিউব বা সিন্ধু চুক্তির মতো উদাহরণ দেখায়, দেশের অভ্যন্তরে ঐক্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী কূটনীতি, আন্তর্জাতিক নীতি ও আস্থাভিত্তিক সহযোগিতা থাকলে নদী সংঘাতকে সহাবস্থানে রূপ দেওয়া সম্ভব।

১৯/০৫/২০২৬

লেখক: সংগঠক, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)