ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ এবছর শেষ হবে
বেনজীন খান
ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে বাংলাদেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির ‘চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত’ সরকারি হিসাব নেই। কারণ ক্ষতি শুধু সরাসরি পানির ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানি, লবণাক্ততা, স্বাস্থ্য, শিল্প, এমনকি আঞ্চলিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও। তবু বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি মূল্যায়ন মিলিয়ে বলা যায়, ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশকে বহু বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি বিশিষ্ট ভূগোলবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা তাঁর গবেষণা ও গ্রন্থাবলিতে ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা।
এক নজরে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশের প্রধান ক্ষতিগুলো:
১. নদী ও পানিপ্রবাহের ক্ষতি:
গঙ্গায় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পদ্মা ও এর শাখানদীগুলোতে নাব্য হ্রাস পায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদী ভরাট, চর জেগে ওঠা ও জলাবদ্ধতা বাড়ে।
২. কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি:
সেচ সংকট বৃদ্ধি। ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি।
৩. সুন্দরবন ও পরিবেশগত ক্ষতি:
লবণাক্ততা বৃদ্ধি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। মিঠাপানির মাছ ও জলজ সম্পদের ক্ষয়।
৪. নৌপরিবহন ও বাণিজ্য:
বহু নদীপথ অকার্যকর বা অগভীর হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্যের ব্যয় বেড়েছে।
৫. সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব:
পানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত উদ্বাস্তু বৃদ্ধি। আর্সেনিকযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির আনুমানিক হিসাব:
বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষত ১৯৮০-২০০০ দশকের, ইঙ্গিত দেয় যে:
কৃষি ক্ষতি, মৎস্য সম্পদ ক্ষতি, নদী খনন ব্যয়, নৌপরিবহন ক্ষতি, পরিবেশ পুনর্বাসন ব্যয়, সুন্দরবনের ক্ষতি, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার ক্ষতি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশকে আনুমানিক ১০-৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে, যদিও এটি গবেষণাভেদে ভিন্ন।
অনেক বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যদি ‘প্রাকৃতিক পরিবেশের উপকারী সেবাগুলোর হ্রাস’ এবং ‘জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়ার উপাদান’ যুক্ত করা হয়, তাহলে প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়েও অনেক বেশি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল অর্থের হিসাব নয়; বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্যও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্ভাগ্য! ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ-ভারত ‘গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি’ শুষ্ক মৌসুমে পানিবণ্টনের একটি কাঠামো দিলেও এর সব থেকে বড় দুর্বলতা ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ না থাকা। ফলে এই চুক্তি ফারাক্কায় ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করেনি। অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
তাহলে এখন বাংলাদেশের করণীয় কী?
বাংলাদেশে সম্প্রতি একটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশটি গঙ্গা চুক্তির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী নয় যতটা আগ্রহী ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণে।
সমস্যা হলো, ভারতের গোয়ার্তুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশকে এমন ভাবনা ভাবতে বাধ্য হতে হচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, এটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। কোনো প্রকার বাঁধ বা ব্যারেজ আসলে প্রকৃতিসম্মত নয়। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, বাঁধ হলো পানি আটকে বড় জলাধার তৈরি। আর ব্যারাজ হলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও পানির মোড় ঘোরানো।
এ-সবই অস্বাভাবিক। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের উপর হস্তক্ষেপ। এর ভয়াল প্রতিক্রিয়া প্রাণ-প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকার উপরে নানাভাবে বর্ষিত হয়।
চলতি বছর ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে নীতিগতভাবে অনেকটা এগিয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত?
বিশেষজ্ঞদের মতে এটি অত্যন্ত তড়িঘড়ি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। পদ্মা ব্যারেজের আগে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না। চুক্তি হওয়ার পরও আমরা ধারাবাহিকভাবে ন্যায্য হিস্যা পাইনি।
১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ৫২ শতাংশ সময় বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পায়নি। আর সবচেয়ে সংকটকাল- ১১ মার্চ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত- এই হার ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ।
ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে পানি ৫০-৫০ ভাগে ভাগ হয়। ফলে মোট প্রবাহ যদি ৫০ হাজার কিউসেক হয়, বাংলাদেশ পাবে মাত্র ২৫ হাজার কিউসেক, যদিও চুক্তি অনুযায়ী তার পাওয়ার কথা ছিল ৩৫ হাজার কিউসেক।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, ডিসেম্বর ২০২৬-এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কী হবে? আমার মতে, পদ্মা ব্যারেজের আলোচনা আপাতত স্থগিত রেখে প্রথমে শক্তিশালী গঙ্গা চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল; বর্তমান চুক্তিতে নেই। নতুন চুক্তি আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত এবং সম্ভব হলে শুধু শুষ্ক মৌসুম নয়, পুরো ১২ মাসকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতা বদলে যাচ্ছে। তাই একটি ‘অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি’ দরকার, যাতে শুধু পানি নয়, পলির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং নতুন উজানের প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশকে জানানো বাধ্যতামূলক হয়।
অতএব, নতুন চুক্তির আগে জাতীয় অবস্থান স্পষ্ট করে বাংলাদেশকে এখনই উচিত সর্বদলীয়, বিশেষজ্ঞভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক একটি জাতীয় পানি কূটনীতি তৈরি করে বিষয়টিকে বহুপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
২০/০৫/২০২৬
লেখক: সংগঠক, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট